কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
চোখ দুটো ছলছল করছিল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগলেন, ‘যতদিন বাঁচব নাতি বা কোনও আত্মীয়ের কাছে আর ফিরে যেতে চাই না।’ এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন অশীতিপর শোভা রিতা গুরুং। শনিবার গভীর রাতে ইসকন রোডের একটি হোমে ঠাঁই হয় তাঁর। ছোট থেকে কোলেপিঠে করে যে নাতিকে বড় করেছেন, সেই নাতিই এভাবে অচেনা অজানা জায়গায় ফেলে চলে যাবে, এখনও যেন ভাবতে পারছেন না শোভা।
চিকিৎসা করানোর নাম করে সিকিম থেেক শিলিগুড়ির ভক্তিনগরের একটি লজে অশীতিপর দিদা শোভাকে ছেড়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন নাতি বিশাল ড্যানিয়াল তামাং। অসহায় অবস্থায় ২০ দিন ধরে সেই লজেই পড়ে ছিলেন শোভা। অবশেষে এনজেপি থানার সহযোগিতায় তাঁকে হোমে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ইসকন রোডের একটি হোমে শনিবার রাতে শোভাকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হোমে যাওয়ার পর থেকেই নাতির স্বার্থপরতার কথা বারেবারে চিন্তা করে কেঁদেছেন বৃদ্ধা। অবশ্য হোম কর্তৃপক্ষ শোভাকে সামলে তাঁর পাশে সবসময় থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। রবিবার বৃদ্ধা বলেন, ‘আমাকে রাস্তায় ফেলে দিলেও দুঃখ হবে না। কেবল যতদিন বাঁচব নাতির কাছে আর ফিরে যেতে চাই না।’
আরও পড়ুনঃ জল্পনার অবসান, বিজেপিতে জায়গা নেই রাজন্যা-প্রান্তিকের
গত ১৬ নভেম্বর চিকিৎসা করানোর কথা বলে শোভার নাতি ড্যানিয়েল তাঁকে সিকিম থেকে শিলিগুড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর এনজেপি স্টেশন সংলগ্ন একটি লজে দিদাকে নিয়ে ওঠেন। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করে নিয়ে আসার কথা বলে বৃদ্ধাকে একা ফেলে উধাও হয়ে যান ড্যানিয়েল। বারেবারে লজ কর্তৃপক্ষ ড্যানিয়েলকে ফোন করলেও তিনি ফিরে আসেননি। শেষে বাধ্য হয়ে লজ কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহযোগিতা নেন। লজের মালিক ইন্দ্রজিৎ কুণ্ডুর ছেলে দেবজিতের উপস্থিতিতে শনিবার গভীর রাতে পুলিশ বৃদ্ধাকে হোমে নিয়ে যান। দেবজিৎ বলেন, ‘হোম কর্তৃপক্ষ ড্যানিয়েলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেভাবে বৃদ্ধাকে অসহায়ভাবে আমাদের লজে ছেড়ে তাঁর নাতি উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, তা মেনে নেওয়া যায় না। মামলা করা হলে তাতে আমি সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তত।’
কলকাতার তিলজলার একটি ভাড়াবাড়িতে ড্যানিয়েলকে ছোট থেকে বড় করেছেন শোভা। ড্যানিয়েলের বয়স যখন সাত মাস, সেসময়েই ড্যানিয়েলের মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। মেয়ে ও নাতির দায়িত্ব তখন থেকেই শোভার ওপর ছিল। পরে বৃদ্ধার মেয়ে কলকাতায় অন্য বাড়িতে চলে যান। এদিকে, ড্যানিয়েল সিকিমে বিয়ে করে নেন। এক বছর আগে তিনি দিদাকে নিয়ে কলকাতা থেকে সিকিমে চলে যান। কিন্তু সেখানে পারিবারিক সমস্যা হয়। তারপরই সিকিম থেকে দিদাকে শিলিগুড়িতে চিকিৎসা করানোর নামে নিয়ে আসেন।
ইসকন রোডের হোমের তরফে পূজা মোক্তার বলেন, ‘লজ কর্তৃপক্ষ বৃদ্ধাকে যদি সেখান থেকে বের করে দিত, তাহলে কী হত? এই ঠান্ডায় রাস্তায় তাঁকে ঘুরতে হত। লজ কর্তৃপক্ষ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা বৃদ্ধার নাতির বিরুদ্ধে মামলা করব। এতে বৃদ্ধা সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন।’
এদিকে এদিন ড্যানিয়েল বলেন, ‘আমি নিজে অসুস্থ। পারিবারিক সমস্যার জন্য দিদাকে আমার সঙ্গে রাখা কঠিন। দিদাকে হোমে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। তিনি হোমে রয়েছেন জেনে ভালো লাগল।’









