খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতি এবার কার্যত পতনের দোরগোড়ায়। আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি আর বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারে টান পড়ার পর এবার সরকারি কর্মীদের পকেটে কাঁচি চালাতে বাধ্য হলো ইসলামাবাদ। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর কর্মীদের বেতনে এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কোপ মারার সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়েছেন। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং লোহিত সাগরের সংকটের জেরে দেশজুড়ে চলা তীব্র জ্বালানি আকাল সামাল দিতেই এই ‘নজিরবিহীন’ কৃচ্ছ্রসাধন বলে দাবি করছে পাক সরকার।
আরও পড়ুনঃ শেষ SFI কলকাতা জেলার ৩৪তম সম্মেলন, বদল হল SFI নেতৃত্বে
পাকিস্তানি আমজনতার কাছে এই সিদ্ধান্ত যেন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। এমনিতেই নিত্যপণ্যের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে, তার ওপর আয়ের এই ব্যাপক হ্রাসে ঘোর সঙ্কটে পড়লেন কয়েক লক্ষ সরকারি কর্মচারী। শাহবাজ সরকারের এই কঠোর সিদ্ধান্ত আসলে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির কোষাগার এখন কতটা শূন্য। কেবল বেতন ছাঁটাই নয়, জ্বালানি বাঁচাতে সরকারি দপ্তরে এসি বা বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে।
শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, দেশের এই কঠিন সময়ে ত্যাগ স্বীকার করা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কঠিন শর্ত পূরণ এবং দেউলিয়া হওয়া আটকাতে এই ধরণের ‘তিতা’ দাওয়াই দেওয়া ছাড়া সরকারের হাতে কোনো বিকল্প নেই। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, নেতাদের বিলাসিতায় কেন রাশ টানা হচ্ছে না, কেবল সাধারণ কর্মীরাই কেন বলির পাঁঠা হবে?
জ্বালানি সংকটের অভিঘাত পাকিস্তানে এতটাই প্রবল যে, বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হচ্ছে দিনের পর দিন। পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য লম্বা লাইন এখন প্রাত্যহিক দৃশ্য। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোতে যে কর্মচাঞ্চল্য আগে দেখা যেত, বেতন ছাঁটাইয়ের পর তা পুরোপুরি স্তিমিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কর্মীদের মনোবল তলানিতে ঠেকায় দেশের উৎপাদন ও পরিষেবা ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটেরও প্রতিফলন। লোহিত সাগরে চলমান যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাকিস্তানের আমদানি বাণিজ্যে। জ্বালানি তেলের বিপুল আমদানিশুল্ক মেটাতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই সরকার এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হওয়াও বিচিত্র নয়।
বেতন ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ ও রান্নার গ্যাসের দাম আরও বাড়ার সঙ্কেত মিলছে। পাকিস্তানের সিন্ধু বা পাঞ্জাব প্রদেশের সরকারি দফতরগুলোতে ইতিমধ্যেই বিক্ষোভের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। শাহবাজ শরিফ অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই এই ছাঁটাই হওয়া বেতন ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু সেই ‘স্বাভাবিক’ দিন কবে আসবে, তা নিয়ে খোদ সরকারি আমলারাই সন্দিহান।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূল এখনও অভিযোগই করল না! অথচ রাতেই পথে সজল
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো এই সুযোগে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইমরান খানের সমর্থকরা শাহবাজ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘দেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দেওয়ার’ সামিল বলে কটাক্ষ করছেন। পাকিস্তানের এই করুণ দশা দেখে আন্তর্জাতিক দুনিয়াও এখন হাত তুলে নিতে শুরু করেছে। খোদ চীন বা সৌদি আরবের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও নতুন করে ঋণ দিতে দুবার ভাবছে। ফলে ঋণের দায়ে জর্জরিত পাকিস্তানের সামনে এখন কেবলই অন্ধকার।
পরিশেষে, পাকিস্তানের এই চরম দুর্দশা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুধার্ত ও রিক্ত এক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অস্থিরতা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। শাহবাজ শরিফ কি পারবেন এই অতল গহ্বর থেকে দেশকে টেনে তুলতে, নাকি এই বেতন ছাঁটাই কেবল এক দীর্ঘ পতনের সূচনা মাত্র— উত্তর দেবে সময়। আপাতত ইসলামাবাদের রাস্তা জুড়ে কেবলই অনিশ্চয়তা আর ক্ষোভের ছায়া।







