রাত বারোটা পেরোলেই নাকি জায়গাটা বদলে যায়। দোকানের আলো নিভে যায়, ভক্তদের ভিড় থামে। কিন্তু অশ্বত্থ গাছটার ছায়ায় নাকি তখনও কেউ বসে থাকে… নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারের দিকে। লোকেরা বলে—ওটা শুধু মন্দির নয়, ওটা আদালত। বড় আদালত। বড়কাছারি।
আরও পড়ুনঃ সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীলষষ্ঠী; গাজন ও নীলষষ্ঠী পুজো
বর্গি হাঙ্গামা ও ‘ভূতকাছারি’র জন্ম:
ইতিহাস বলছে, সময়টা ১৭৫৫ সাল। বাংলার নবাব আলিবর্দী খাঁর শাসনের শেষ পর্ব। মারাঠা বর্গীদের লুঠতরাজ আর তাণ্ডবে যখন বাংলা জ্বলছে, তখন সব হারানো মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই নির্জন শ্মশান-জঙ্গলে। সবর্ণ রায়চৌধুরীদের তালুকের অন্তর্গত এই ঝিকুরবেড়িয়া গ্রাম তখন ছিল এক ভীতিপ্রদ স্থান। সেই ভয়াবহ সময়েই মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায়—এই শ্মশানে স্বয়ং ‘ভূতনাথ’ (শিব) বিচারসভা বসান। অন্যায়কারীর শাস্তি আর নিরপরাধের রক্ষা যেখানে নিশ্চিত। সেই থেকেই এর নাম হয় ‘ভূতকাছারি’, যা আজ মানুষের মুখে মুখে ‘বড়কাছারি’।
অশ্বত্থ গাছ ও এক বাকসিদ্ধ সাধুর রহস্য:
বহু বছর আগে এক মহাপুরুষ এই শ্মশানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর আশীর্বাদে মানুষের দীর্ঘদিনের মামলা মিটে যেত, মরণাপন্ন রোগী সুস্থ হতো। ভক্তরা বিশ্বাস করতেন, তিনি সাধারণ সন্ন্যাসী নন, স্বয়ং ভূতনাথের প্রকাশ। তাঁর দেহাবসানের পর তাঁকে দাহ না করে সেখানেই সমাধিস্থ করা হয়। জনশ্রুতি আছে, সেই সমাধিক্ষেত্র থেকেই জন্ম নেয় আজকের এই বিশাল অশ্বত্থ গাছ। গাছের গোড়ায় স্থাপন করা হয় শিবলিঙ্গ। ১৯৭৮-এর ভয়াবহ বন্যায় প্রাচীন গাছটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভক্তদের বিশ্বাস হার মানেনি; নতুন করে রোপণ করা অশ্বত্থই আজ কয়েক লক্ষ মানুষের শেষ ভরসা।
আরও পড়ুনঃ এই গান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল দূরদর্শনে! ভাবতে পারেন
ছোট কাগজে বড় আরজি:
এখানে কোনো পাণ্ডা প্রথা নেই। মানুষ নিজেই পূজা দেয়, দুধপুকুরে স্নান করে দণ্ডি কাটে। মঙ্গলবার আর শনিবার এখানে যে মানুষের ঢল নামে, তা দেখার মতো। জমিজমা বিবাদ থেকে শুরু করে সন্তান কামনা—সব সমস্যার কথা মানুষ ছোট ছোট কাগজে লিখে গাছের ডালে বেঁধে দিয়ে যায়। আজও বিশ্বাস করা হয়, পৃথিবীর আদালতে বিচার না মিললেও, বড়কাছারির ‘বড় আদালত’ কাউকে খালি হাতে ফেরায় না।
বিশ্বাস নাকি অলৌকিকতা?
ইতিহাস একভাবে ব্যাখ্যা দেয়, আর লোককথা অন্যভাবে। কিন্তু যারা গোধূলি বেলার পর ওই অশ্বত্থের ছায়ায় দাঁড়িয়েছে, তারা জানে—ওখানকার বাতাসও অন্যরকম। সব শব্দ থেমে গেলে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে যেন আজও কারও নীরব উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
হয়তো সেটা শুধুই বিশ্বাস, হয়তো ভয়, অথবা গভীর কোনো ভরসা। কিন্তু একটা কথা আজও সবাই একবাক্যে বলে— “এই আদালতে অন্যায় টেকে না।”



