তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর বাংলার রাজনীতিতে ‘ভাতা’ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের ফল সেই পুরনো ধারণা এক লহমায় ওলটপালট করে দিল। দীর্ঘ পনেরো বছরের জমানার ইতি টেনে নবান্নে এখন গেরুয়া আবির। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, যুবশ্রী বা রূপশ্রীর মতো প্রকল্প তৃণমূলকে বারবার বৈতরণী পার করিয়েছে, এবার তাতে কেন চিঁড়ে ভিজল না?
আরও পড়ুনঃ ‘অনাচার কর যদি, রাজা তবে ছাড়ো গদি’; শ্রষ্টার জন্মমাসেই বাংলায় খান খান ‘হীরক রানী’
ভোটের আগে এবার লড়াইটা কার্যত ভাতার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তৃণমূল যখন প্রকল্পের টাকা বাড়াচ্ছিল বা ‘যুবসাথী’র মতো নতুন নতুন সুবিধার কথা বলছিল, তখন বিজেপিও পাল্টা ঘোষণা করেছিল – তারা ক্ষমতায় এলে মা-বোনেদের ৩,০০০ টাকা করে দেবে। কিন্তু ভোটের ফল বলছে, মানুষ শুধু ভাতার অঙ্কে পা দেয়নি।
রাজনীতি যারা অল্পবিস্তর বোঝেন, তারা বলছেন শুধু টাকা দিয়ে আর মানুষের মন ভোলানো যাচ্ছিল না। একদিকে ভাতার প্রতিশ্রুতি ছিল ঠিকই, কিন্তু অন্যদিকে ছিল পাহাড় প্রমাণ বেকারত্ব। বাংলার ঘরে ঘরে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় বসে আছে। নবান্ন অভিযান থেকে শুরু করে ধর্মতলায় অবস্থান – সব দেখে সাধারণ মানুষ একটা জিনিস বুঝে গিয়েছিল যে, মাসে কয়েকটা টাকা হাতে আসার চেয়েও বড় হল সম্মানজনক কাজ পাওয়া। মানুষ এবার বুঝিয়ে দিল, তারা স্রেফ হাত পেতে টাকা নিতে চায় না, তারা চায় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ।
বাংলার মহিলারা, যারা বেশিরভাগই তৃণমূলের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধা পেয়ে আসছেন তারাও ভাতার চেয়ে নিজেদের নিরাপত্তাকেই বেশি গুরুত্ব দিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী থেকে শুরু করে অমিত শাহ – বিজেপির নেতারা যখন বারবার নারী সুরক্ষার প্রশ্ন তুলেছেন, তখন সাধারণ ঘরের গৃহিণীরা তাতে সায় দিয়েছেন। ভাতার সুবিধা নিলেও, বাড়ির বাইরে বেরোনোর সময় যে ভয়টা কাজ করত, সেই ভয়টাই শেষমেশ ভোটবাক্সে তৃণমূলের বিরুদ্ধে গিয়েছে।
বঙ্গে ভোটপ্রচারে এসে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীও ভাতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সরাসরি যুবসাথী প্রকল্পকে নিশানা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তুলোধনা করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, যে মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনিই বেকার ভাতার লাইনে দাঁড় করিয়েছেন ৮৪ লক্ষ মানুষকে। দেখা গেল, বঙ্গ ভোটের ফলাফলে কোথাও না কোথাও সেই ইস্যুটিরই প্রতিফলন ঘটল।
আরও পড়ুনঃ ফাইল সরালেই কড়া শাস্তি! নবান্নে জারি হাই-অ্যালার্ট নির্দেশিকা
গত পনেরো বছরে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাও খুব একটা সুখকর ছিল না। প্রতিটি সরকারি কাজে ‘কাটমানি’ দেওয়া, স্থানীয় নেতাদের দাদাগিরি আর তোলাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল জনজীবন। এর সাথে যোগ হয়েছিল ‘তোষণের রাজনীতি’র অভিযোগ। সাধারণ মানুষের মনে হয়েছে, সরকার সবার জন্য সমানভাবে কাজ করছে না।
আজকের ফলাফল প্রমাণ করে দিল যে, শুধু ভাতা দিয়ে বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেশিদিন শাসন করা যায় না। মানুষের পেটের খিদে আর মনের আতঙ্ক যখন সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন তারা ‘পরিবর্তন’ আনতেই বেশি পছন্দ করে। পনেরো বছরের দিদি-রাজ শেষ হয়ে বাংলায় এখন নতুন এক ভোরের সূচনা হল। সাধারণ মানুষের এই বিপুল ভরসা আর পাহাড় সমান প্রত্যাশা নতুন সরকার কতটা পূরণ করতে পারে, এখন সেটাই দেখার।


