চন্দন দাস, কলকাতাঃ
সম্প্রতি একটি ভিডিও দেখিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেলাম। দিদি, অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলার প্রাক্তন (?) মুখ্যমন্ত্রী, একই সঙ্গে তিনটি ফিটনেস যন্ত্র ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান। তাহাকে দেখিতে খুবই শীর্ণকায় মনে হইল। বয়স বৃদ্ধির সহিত পেশির যে সমধিক ক্ষয় হইয়াছে, তাহা প্রতীয়মান হয়। এক হাতে একটি WHOOP ব্যান্ড, অন্য হাতে একটি Apple Watch Ultra, এবং অনামিকায় একটি Oura Ring। বয়স একাত্তর, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন চলিতেছে, এবং তিনি একসঙ্গে তিনখানি যন্ত্রের মাধ্যমে নিজের হৃদস্পন্দন, নিদ্রার গুণমান এবং মানসিক চাপের পরিমাপ লইতেছেন। ভিডিওটি দেখিয়া কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হইয়া রহিলাম। ক্ষণিক হাসিলাম। তাহার পর উপলব্ধি হইল, ইহা কেবল দিদির গল্প নহে, ইহা আমাদের সকলের গল্প।
বাঙালি জাতির একটি অনন্য কৃতিত্ব আছে, সেটি হইল মাপজোকে অসামান্য পারদর্শিতা। কর্মে নহে, কেবলমাত্র মাপিবার ব্যাপারে আমাদের সমকক্ষ পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেহ নাই। রক্তচাপ মাপি দৈনিক তিনবার। শর্করা মাপি প্রাতে ও সায়াহ্নে। ওজন মাপি স্নানের পূর্বে এবং পরে, যেন দেহ মুছিলে দুই কিলোগ্রাম হ্রাস পাইবে। কোলেস্টেরল রিপোর্ট পকেটে বহন করিয়া বেড়াই এবং বন্ধুর গৃহে চা পানের অবসরে বাহির করিয়া বলি, “এই দেখুন, LDL আবার ঊর্ধ্বমুখী।” বন্ধু সমব্যথী হইয়া স্বীয় রিপোর্ট উদঘাটন করেন। অতঃপর উভয়ে মিলিয়া রিপোর্ট বিশ্লেষণে নিমগ্ন হন, এবং পার্শ্বে রক্ষিত মিষ্টান্নের পাত্রটি ক্রমশ শূন্য হইতে থাকে। ইহাই বাঙালির ফিটনেস সংস্কৃতি। তথ্যের প্রাচুর্য আর কর্মের প্রতি অনীহা।
আরও পড়ুনঃ অবশেষে ট্রাম্প জনসমক্ষে নিয়ে এলো ইউএফও এবং ভিনগ্রহের প্রাণীদের নথি!
এইখানে একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় উল্লেখ করিতে হয়। দিদির পরিধানে সর্বদা সেই চিরপরিচিত সাদা সুতির শাড়ি, পদযুগলে সাধারণ হাওয়াই চটি। ইহা তাঁহার রাজনৈতিক পরিচয়ের অঙ্গ, সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক। অথচ সেই সরল আবরণের অভ্যন্তরে, কব্জিতে এবং অঙ্গুলিতে শোভা পাইতেছে এমন তিনটি যন্ত্র, যাহাদের সম্মিলিত মূল্য প্রায় এক লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার টাকা। অর্থাৎ Apple Watch Ultra একাকী আশি হাজার টাকার ঊর্ধ্বে, WHOOP ব্যান্ড সাতাশ হাজার, Oura Ring চল্লিশ হাজার, এবং উপরন্তু মাসিক সাবস্ক্রিপশন। ইহার মূল্যে আনুমানিক আশিখানি সুতির শাড়ি ক্রয় করা যায়, কিংবা সহস্রাধিক জোড়া হাওয়াই চটি। বাহিরে সারল্য, অভ্যন্তরে সিলিকন ভ্যালি। ইহাই বাঙালির চিরন্তন দ্বৈতসত্তা, কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে নহে, প্রায় প্রত্যেক বাঙালির জীবনেই এই দ্বৈততা বিদ্যমান। আমরা মুখে অশ্বগন্ধার গুণগান করি, পকেটে বহন করি বহুমূল্য সাপ্লিমেন্ট। আমরা হাঁটার মাহাত্ম্য কীর্তন করি, এবং স্মার্টফোনে তিনটি ভিন্ন স্টেপ-কাউন্টার অ্যাপ স্থাপন করিয়া রাখি।
দিদিও সেই একই ঐতিহ্যের গৌরবময় ধারক। তিনটি যন্ত্র ধারণ করিয়াছেন, কিন্তু তাহার দেহ ও পেশি দেখিয়া মনে হয় না যে তিনি জীবনে কোন দিন ভারোত্তোলন করিয়াছেন। হাঁটিতেছেন প্রচুর, ইহা প্রশংসনীয়, কেহই ইহার মূল্য অস্বীকার করিতে পারে না। হাঁটায় হৃদযন্ত্র সবল থাকে, মন প্রসন্ন থাকে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু পেশি? পেশি নির্মিত হয় ভারোত্তোলনের ফলে, প্রতিরোধে, সেই কর্মে যেখানে শরীর বলিয়া উঠে “আর সম্ভব নহে।” সেইখানেই পেশির জন্ম।
বাঙালি এই সত্যটি স্বীকার করিতে নারাজ। বাঙালির অভিধানে ভারোত্তোলন মানে “বডি বানানো”, আর “বডি বানানো” এক সন্দেহজনক কর্ম, যাহা পাড়ার জিমে গিয়া কতিপয় তরুণ আয়নার সম্মুখে দাঁড়াইয়া আপন বাইসেপের প্রতি মুগ্ধতা প্রদর্শন করিয়া করেন। ইহা ভদ্রলোকের কর্ম নহে। ভদ্রলোক হাঁটেন। ভদ্রলোক যোগব্যায়াম করেন। ভদ্রলোক অশ্বগন্ধা সেবন করেন। ভদ্রলোক মাপেন। ভদ্রলোক ভারোত্তোলন করেন না।
কিন্তু একটিবার ভাবিয়া দেখুন। একাত্তর বৎসর বয়সে যখন সোপান (সিঁড়ি) অবতরণ কালে জানু কম্পিত হয়, তখন কি WHOOP ব্যান্ডটি সাহায্যে আসিবে? Oura Ring কি বলিয়া উঠিবে, “চিন্তা করিবেন না, আপনার স্লিপ স্কোর উত্তম”? Apple Watch কি ECG প্রদর্শন করিয়া আশ্বাস দিবে, “হৃদযন্ত্র সুস্থ, পতিত হইলেও বিশেষ ক্ষতি হইবে না”? পতিত হইলে অস্থি ভাঙ্গে। অস্থি ভাঙ্গিলে ত্রৈমাস কাল শয্যাশায়ী। শয্যাশায়ী থাকিলে পেশি আরও ক্ষীণ হয়। পেশি ক্ষীণ হইলে পুনরায় পতন। এই চক্রের ডাক্তারি নাম Sarcopenia Spiral, বার্ধক্যের পেশিক্ষয়ের ঘূর্ণিপাক। এই ঘূর্ণিপাকের একটিমাত্র প্রতিষেধক, ভারোত্তোলন। সপ্তাহে অন্তত দুইবার। স্কোয়াট, ডেডলিফট, পুশ-আপ, যাহা হউক, কিছু একটা। এবং এই কথা কেবল একাত্তরের জন্য প্রযোজ্য নহে। চল্লিশের জন্যও সত্য। ত্রিশের জন্যও। কারণ পেশি বস্তুটি অনেকটা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের মতন, যত পূর্বে সঞ্চয় করিবেন, বার্ধক্যে তত অধিক ভারোত্তোলন করিতে পারিবেন।
তবে দিদিকে কী পরামর্শ দিব? বলিব, যন্ত্র কয়েকটি কিছুক্ষণ খুলিয়া রাখুন। তিনটির মধ্যে একটিই যথেষ্ট। অবশিষ্ট দুইটির মূল্যে এক জোড়া উৎকৃষ্ট ডাম্বেল ক্রয় করিলে এখনও পঁচাত্তর হাজার টাকা অবশিষ্ট থাকিবে। পঞ্চ কিলোগ্রাম দিয়া আরম্ভ করুন। সপ্তাহে দুইদিন। দশ মিনিট। ব্যস। তথ্য থাকুক, কিন্তু তথ্য যেন কর্মে পরিণত হয়। অন্যথায় তথ্য কেবলমাত্র এক প্রকার সান্ত্বনা, “আমি তো কিছু একটা করিতেছি” বলিয়া মনকে প্রবোধ দিবার এক সুকৌশল মাত্র।
আসুন আমরা যাহারা দিদিকে দেখিয়া হাসিতেছি তাহারাও দর্পণের সম্মুখে দণ্ডায়মান হই। আমাদের পকেটেও রিপোর্ট আছে। আমাদের দূরভাষ যন্ত্রেও Step Counter অ্যাপ আছে। আমরা অনেকেই মাপি, কিন্তু ভারোত্তোলন করি না। নিজের পেশির দিকে নজর দেই না। দিদি অন্তত তিনখানি যন্ত্র ধারণ করিয়াছেন। তিনি স্বীয় স্বাস্থ্য নিয়া অতীব সচেতন। আমরা অনেকেই আছি যাহারা একটিও ফিটনেস যন্ত্র অঙ্গে ধারণ করি নাই, এমনকি সমগ্র জীবনে একটি ডাম্বেল স্পর্শ করিবারও প্রয়োজন বোধ করি নাই। এই রচনাটি তাই কেবল দিদির ব্যক্তিগত আখ্যান নহে, ইহা আমাদের সকলের আত্মপ্রবঞ্চনার দর্পণ।
আরও পড়ুনঃ ‘চোখে ঠুলি বেঁধে থেকো না…’, মমতাকে ধৃতরাষ্ট্র বলে খোঁচা ফিরহাদের মেয়ের
যন্ত্রপাতির বিবরণ সংক্রান্ত পাদটীকা:
১. WHOOP ব্যান্ড (WHOOP Band): এটি একটি স্ক্রিনবিহীন ফিটনেস ট্র্যাকার, যাহা মূলত শরীরচর্চাকারীদের ধকল (Strain), পুনরুদ্ধার (Recovery) এবং নিদ্রার গুণমান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করিবার জন্য ব্যবহৃত হয়। ইহার বিশেষত্ব হইল এটি ব্যবহারকারীর শারীরিক সক্ষমতার নিরিখে প্রতিদিনের কর্মতৎপরতার পরামর্শ প্রদান করে।
২. অ্যাপল ওয়াচ আল্ট্রা (Apple Watch Ultra): অ্যাপল সংস্থার সর্বাধুনিক এবং সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী স্মার্টঘড়ি। এটি মূলত পর্বতারোহী, ডুবুরি এবং অ্যাথলিটদের জন্য নির্মিত, যাহাতে উন্নত মানের জিপিএস (GPS), ইসিজি (ECG) এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপক যন্ত্র রহিয়াছে। ইহার স্থায়িত্ব ও ব্যাটারি ক্ষমতা সাধারণ স্মার্টঘড়ির তুলনায় অনেক অধিক।
৩. আউরা রিং (Oura Ring): এটি একটি অত্যাধুনিক স্মার্ট আংটি, যাহা আঙুলের ধমনী হইতে শরীরের তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন এবং ঘুমের চক্র পর্যবেক্ষণ করে। কব্জিতে ঘড়ি পরিধান করিতে যাহারা অস্বস্তি বোধ করেন, তাহাদের নিকট পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি (Wearable Tech) হিসেবে এটি বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয়।


