মহারাষ্ট্রের তপ্ত দুপুরের সূর্য যখন ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগুন ঝরাচ্ছে পশ্চিম বিদর্ভের মাটিতে, তখন সেই উত্তাপ কেবল ভূখণ্ডকে শুষ্ক করছে না, বরং ছাই করে দিচ্ছে কয়েক লক্ষ কৃষকের সারা বছরের স্বপ্নকে। বর্তমান ভারতের কৃষি মানচিত্রে মহারাষ্ট্রের সোলাপুর এবং নাসিক বলয় আজ এক শোকাতুর জনপদে পরিণত হয়েছে। যেখানে বিঘার পর বিঘা জমিতে ফলানো পেঁয়াজ এখন কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের গভীরতা বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সোলাপুরের কারমালা তালুকার এক প্রান্তিক কৃষক অঙ্কুশ আন্না গুঞ্জালের দিকে। তাঁর জীবনের সাম্প্রতিক এক অভিজ্ঞতা আজ ভারতের কৃষি ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটাকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুনঃ মধ্যবিত্তের পকেটে টান! এফএমসিজি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি
অঙ্কুশ গুঞ্জাল তাঁর রক্তজল করা পরিশ্রমে ফলানো ৭৩ বস্তা পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন এক বুক আশা নিয়ে। ফসল বিক্রি করে যে ৫,০৬৮ টাকা তিনি হাতে পেলেন, তার আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক মিনিট। বাজার কমিটির হিসাব নিকেষ শেষে যখন পরিবহন খরচ, ওজন করার পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য লেভি কেটে নেওয়া হলো, তখন তাঁর হাতে অবশিষ্ট রইল মাত্র ৪০০ টাকা। ৭৩ বস্তা ফসল, যা ফলাতে কয়েক মাস ধরে কয়েক হাজার টাকার সার, বীজ এবং শ্রম বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তার নিট মুনাফা দাঁড়ালো মাত্র ৪০০ টাকা। এই মর্মান্তিক বাস্তবতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে পেঁয়াজের দর নেমে এসেছে কেজি প্রতি মাত্র ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ এক কুইন্টাল পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০ টাকায়, যেখানে সরকারি হিসেবেই এক কুইন্টাল পেঁয়াজ উৎপাদনের নূন্যতম খরচ হওয়া উচিত ছিল ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা।
“যখন আন্তর্জাতিক বাজারের সমীকরণ আর অভ্যন্তরীণ নীতিমালার সমন্বয় ঘটে না, তখন ফসলের দাম ৫০ পয়সায় নামা কেবল অর্থনৈতিক মন্দা নয়, বরং অন্নদাতার মর্যাদার ওপর এক চরম আঘাত।”
এই নজিরবিহীন দরপতনের পেছনে কাজ করছে একাধিক আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় কারণ। প্রথমত, পশ্চিম এশিয়ায় বা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, যাকে অনেকে ‘উপসাগরীয় যুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন, তা ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বাণিজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। ভারত থেকে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি বিশাল অংশ দুবাই, সৌদি আরব এবং কুয়েতের বাজারে পাঠানো হয়। যুদ্ধের প্রভাবে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধের মুখে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কন্টেইনার ভাড়ার ওপর। যে কন্টেইনার আগে ২,১৫০ ডলারে পাওয়া যেত, তার বর্তমান ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯,৭০০ ডলারে। ফলে জওহরলাল নেহরু বন্দরে হাজার হাজার টন পেঁয়াজ আটকে পড়েছে, যা বিদেশের বাজারে না যেতে পেরে এখন দেশের অভ্যন্তরীণ মান্ডিতে উপচে পড়ছে। এই কৃত্রিম জোগানের বাড়বাড়ন্তই দামকে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিকে এনেছে।
প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। পশ্চিম বিদর্ভের তাপমাত্রা এখন ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এই প্রচণ্ড গরমে পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ আর্দ্রতা শুকিয়ে যাচ্ছে এবং তাতে এক ধরণের কালো পচন বা ‘ব্ল্যাক মোল্ড’ দেখা দিচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে অকাল বৃষ্টি। বৃষ্টির জল একবার পেঁয়াজের গায়ে লাগলে তা আর গুদামজাত করা সম্ভব হয় না। মহারাষ্ট্রের কৃষকেরা সাধারণত ‘গাড়োয়া’ বা গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ৬ মাস পর্যন্ত মজুত করে রাখতে পারেন, কিন্তু এবারের আবহাওয়া সেই সুযোগটুকুও কেড়ে নিয়েছে। পচনশীল এই ফসল বাড়িতে ফিরিয়ে এনে নষ্ট করার চেয়ে কৃষকেরা বাজারে জলের দরে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘ডিসট্রেস সেল’।
মহারাষ্ট্রের এই আগুনের আঁচ কি পশ্চিমবঙ্গেও পৌঁছেছে? তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গের কৃষি চিত্র কিছুটা ভিন্ন হলেও এর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। এ রাজ্যের নদীয়া, মুর্শিদাবাদ বা বর্ধমানের পেঁয়াজ চাষীরা এখনও কুইন্টাল পিছু ১,৬০০ থেকে ১,৮০০ টাকা দর পাচ্ছেন, যা মহারাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। এর কারণ হলো পশ্চিমবঙ্গ মূলত পেঁয়াজ আমদানিকারী রাজ্য। নাসিকের পেঁয়াজ এখানে আসতে যে পরিমাণ পরিবহন খরচ যুক্ত হয়, তা স্থানীয় বাজারের দরকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখে। তবে মহারাষ্ট্রের বাজার এভাবে ভেঙে পড়লে সেখানকার সস্তা পেঁয়াজ যখন পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বন্যা বইয়ে দেবে, তখন এ রাজ্যের চাষীরাও তাদের ফসলের ন্যায্য দাম হারাবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ মসনদে শুভেন্দু বসতেই রাস্তায় বাংলাদেশি ইসলামপন্থী সংগঠন
এই পুরো সংকটের মূলে রয়েছে পেঁয়াজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা এমএসপি (MSP) না থাকা। ধান বা গমের ক্ষেত্রে সরকার যেভাবে দামের নিশ্চয়তা দেয়, পেঁয়াজের মতো পচনশীল ফসলের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সুরক্ষা কবচ নেই। যদিও নাফেড বা এনসিসিএফ-এর মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি বাফার স্টক তৈরির জন্য পেঁয়াজ সংগ্রহ করে, কিন্তু তাদের সংগ্রহের পরিমাণ মোট উৎপাদনের তুলনায় খুবই সামান্য। তদুপরি, তারা কেবল ভালো মানের পেঁয়াজ কেনে, যার ফলে আবহাওয়া বা গরমে ক্ষতিগ্রস্ত পেঁয়াজ নিয়ে কৃষকেরা ফড়িয়াদের খপ্পরে পড়তে বাধ্য হন। নাসিকের লাসালগাঁও বাজারে কৃষকদের বিক্ষোভ এখন গণ-আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে। তাঁদের দাবি খুব স্পষ্ট— কুইন্টাল পিছু অবিলম্বে ১,৫০০ টাকা ভরতুকি দিতে হবে এবং পেঁয়াজকে স্থায়ীভাবে এমএসপি-র আওতায় আনতে হবে।
কৃষকের এই হাহাকার কেবল এক মরসুমের লোকসান নয়। আজ যে কৃষক ৫০ পয়সা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করে নিঃস্ব হলেন, তিনি আগামী বছর এই ফসল চাষ করার সাহস পাবেন না। এর ফলে আগামী দিনে যখন জোগানে ঘাটতি দেখা দেবে, তখন শহরবাসীকে সেই পেঁয়াজই কিনতে হতে পারে ১০০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ বর্তমানের এই অব্যবস্থা যেমন উৎপাদনকারীকে ধ্বংস করছে, তেমনি ভবিষ্যতে উপভোক্তার পকেটেও টান ফেলবে। সরকারকে বুঝতে হবে, কৃষি কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক যুদ্ধের প্রভাব রুখতে যেমন রফতানি নীতিতে পরিবর্তন দরকার, ঠিক তেমনি কৃষকের পরিশ্রমের মর্যাদা রক্ষায় একটি স্থায়ী দাম নির্ধারণ কাঠামো আজ সময়ের দাবি। অঙ্কুশ গুঞ্জালের সেই ৪০০ টাকা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যদি আজ আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী দিনে ভারতের কৃষিক্ষেত্র এক স্থায়ী মরুভূমিতে পরিণত হবে।


