তুমি যদি ভারতের যেকোনো প্রান্তের একটি সরকারি স্কুলের দিকে তাকাও, দেখবে সেখানে নতুন রঙের প্রলেপ পড়েছে, মিড-ডে মিলের ধোঁয়া উড়ছে, আর খাতায় কলমে উপস্থিতিও বাড়ছে। কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঙ্কালসার কাঠামো। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্ট— ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া: টেম্পোরাল অ্যানালাইসিস অ্যান্ড পলিসি রোডম্যাপ ফর কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট’—আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা শিশুদের স্কুলে পাঠাতে পারলেও তাদের প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত করতে পারছি না।
২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, এই জরাজীর্ণ শিক্ষা কাঠামো কি তার ভার বইতে পারবে? ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে। প্রতিটি শিশু স্কুলে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে কী শিখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের অবকাঠামো ছাড়িয়ে ক্লাসরুমের ভেতরের সেই করুণ বাস্তবতাকে ছুঁতে হবে।
এই সংকটের শুরুটা হয় আমাদের শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে। তুমি হয়তো ভাববে, শিক্ষক নিয়োগের জন্য এত সব পরীক্ষা আর ডিগ্রি আছে, তবুও কেন এই হাল? নীতি আয়োগের ২০২৬ সালের রিপোর্টে একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান উঠে এসেছে—প্রাথমিক স্তরের গণিত পরীক্ষায় দেশের মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষক ৭০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছেন। এমনকি জাতীয় স্তরে শিক্ষকদের গড় স্কোর নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৬ শতাংশে।
আরও পড়ুনঃ হেলমেট ছাড়া বাইক চালালেই পাকড়াও, রণংদেহী রূপে কলকাতা পুলিশ
অর্থাৎ, যে কারিগররা দেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন, তাদের একটি বিশাল অংশের বুনিয়াদি শিক্ষাতেই চরম ঘাটতি রয়েছে। এই অদক্ষতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে শিক্ষার্থীদের ওপর। ‘পরখ ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণির ৩০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনে ভগ্নাংশের বা দশমিকের সামান্য প্রয়োগও বুঝতে পারে না। তুমি দেখবে, আমাদের শিশুরা তোতাপাখির মতো মুখস্থ করতে পারলেও সমস্যা সমাধানের মৌলিক দক্ষতা হারিয়ে ফেলছে।
ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোটি বর্তমানে একটি খণ্ডিত পিরামিডের মতো। তুমি শুনলে অবাক হবে যে দেশে প্রায় ৭.৩ লাখ প্রাথমিক স্কুল থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের স্কুলের সংখ্যা মাত্র ১.৬৪ লাখ। এই বিপুল অসমতা একটি পদ্ধতিগত বাধা বা ‘ড্রপ-আউট ট্র্যাপ’ তৈরি করছে। একজন শিক্ষার্থী যখন পঞ্চম শ্রেণি পাস করে, তখন তাকে পরবর্তী স্তরে ওঠার জন্য কয়েক মাইল দূরের অন্য একটি স্কুলে যেতে হয়।
আবার দশম শ্রেণির পর দ্বাদশে ওঠার জন্য তাকে ফের পরিবেশ বদলাতে হয়। প্রতিটি স্তরে এই বারবার স্কুল বদলানোর প্রক্রিয়া অনেক শিক্ষার্থীর পড়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে যাতায়াত ও নিরাপত্তা বড় হয়ে দাঁড়ায়। নীতি আয়োগ বলছে, উত্তরপ্রদেশের মতো বড় রাজ্যে মাত্র ২.৯ শতাংশ স্কুলে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। বাকি ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থীকে এই খণ্ডিত পথে বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে, যা তাদের মাঝপথেই স্কুল ছাড়তে বাধ্য করছে।
পরিকাঠামোর দিকে তাকালে এক মরীচিকা তোমার চোখে পড়বে। গত এক দশকে ৯২ শতাংশের বেশি স্কুলে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে এবং পানীয় জলের ব্যবস্থাও সন্তোষজনক। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে যে ‘সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ দরকার, সেখানে আমরা আজও পিছিয়ে। তুমি দেখবে, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে যেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে কার্যকরী স্মার্ট ক্লাসরুমের হার ৬ শতাংশের নিচে। দেশের প্রায় ১.১৯ লাখ স্কুলে আজও বিদ্যুৎ সংযোগ কার্যকরী নয়।
মাধ্যমিক স্তরে ৫০ শতাংশ সরকারি স্কুলে আজও কোনো কার্যকরী বিজ্ঞান গবেষণাগার নেই। আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সেমিকন্ডাক্টর বিপ্লব নিয়ে কথা বলছি, তখন আমাদের কয়েক কোটি শিক্ষার্থী জীবনের প্রথম কম্পিউটারটিও ছোঁয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এই ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনে এক নতুন ধরণের সামাজিক বৈষম্য তৈরি করবে, যেখানে শহরের সচ্ছল ঘরের সন্তানরা প্রযুক্তির উদ্ভাবক হবে, আর গ্রামের সন্তানরা হবে বড়জোর তার সাধারণ ব্যবহারকারী।
আরও পড়ুনঃ শিব তাণ্ডব স্ত্রোত্রপাঠে বিশ্বরেকর্ড ভারতীয় শিশুর
এই সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের আস্থায়। তুমি যদি গত ২০ বছরের পরিসংখ্যান লক্ষ্য করো, তবে দেখবে সরকারি স্কুলগুলোর ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস ক্রমে কমছে। ২০০৫ সালে যেখানে ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি স্কুলে পড়ত, ২০২৫-২৬ সালের হিসেবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯.২৪ শতাংশে। এর অর্থ হলো, অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এখন বেসরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এমনকি অতি দরিদ্র পরিবারগুলোও তাদের পেট কেটে সন্তানদের নিম্নমানের প্রাইভেট স্কুলে পাঠাচ্ছে।
নীতি আয়োগ বলছে, বর্তমানে ভারতজুড়ে ৭,৯৯৩টি স্কুল এমন আছে যেখানে বর্তমানে একজন ছাত্রও ভর্তি নেই। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই আছে ৩,৮১২টি। এই ‘ঘোস্ট স্কুল’ বা শূন্য ছাত্রের স্কুলগুলো বর্তমানে রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ১ লাখেরও বেশি স্কুল চলছে মাত্র একজন শিক্ষকের ভরসায়, যেখানে একাই সব ক্লাস আর প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকছে।
এই জরাজীর্ণ দশা থেকে মুক্তি পেতে নীতি আয়োগ যে দাওয়াই দিয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ‘কম্পোজিট স্কুল’ (Composite Schools) বা সমন্বিত স্কুল মডেল। তুমি যদি বর্তমানে ভারতের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্কুলগুলোর দিকে তাকাও, দেখবে অধিকাংশেরই নিজস্ব কোনো পরিচয় তৈরি হচ্ছে না। নীতি আয়োগের প্রস্তাব হলো, একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা ছোট স্কুলগুলোকে একীভূত করে একটি বড় কেন্দ্রীয় ক্যাম্পাস তৈরি করা।
যেখানে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব সুবিধা এক ছাদের তলায় থাকবে। এর ফলে সেই বারবার স্কুল বদলানোর যে আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, তার অবসান ঘটবে। তুমি ভেবে দেখো, একটি বড় ক্যাম্পাসে যখন ৩০০ বা ৫০০ শিক্ষার্থী থাকবে, তখন সেখানে উন্নত লাইব্রেরি, খেলার মাঠ এবং আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা সরকারের পক্ষেও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হবে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটি শিশুদের জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাজীবনের গ্যারান্টি।
শূন্য ছাত্রের স্কুল বা ‘ঘোস্ট স্কুল’ নিয়ে যে ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে, তা নিয়ে রাষ্ট্রের এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তুমি জানলে অবাক হবে যে, ভারতজুড়ে যে প্রায় ৮,০০০ স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী নেই, তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষকদের বেতনের পেছনে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ এবং তেলঙ্গানার মতো রাজ্যে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি।
নীতি আয়োগ স্পষ্ট বলছে, এই অলাভজনক স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়ে সেখানকার সম্পদ ও শিক্ষকদের বড় স্কুলে স্থানান্তরিত করতে হবে। এতে করে সম্পদের সুষম বণ্টন সম্ভব। ১ লাখেরও বেশি স্কুল বর্তমানে যে ‘একক শিক্ষক’ ব্যবস্থার অভিশাপে জর্জরিত, এই একীভূতকরণের ফলে সেই স্কুলগুলোও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পাবে। অর্থাৎ, গণিতের শিক্ষক শুধুমাত্র গণিতই পড়াবেন, তাকে আর একই সাথে ইতিহাস বা মিড-ডে মিলের চাল মাপতে হবে না।
শিক্ষকদের কাজের মানোন্নয়ন নিয়ে যে প্রস্তাব এই রিপোর্টে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত বৈপ্লবিক। তুমি হয়তো জানো যে, ভারতের একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষককে পড়াশোনার বাইরেও নির্বাচন, জনশুমারি এবং নানাবিধ সরকারি সমীক্ষায় অংশ নিতে হয়। তথ্য বলছে, একজন শিক্ষক তার কর্মসময়ের প্রায় ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ ব্যয় করেন এই ধরণের অ-শিক্ষামূলক কাজে।
নীতি আয়োগের রোডম্যাপে এই ‘টাইম-অন-টাস্ক’ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের এই সমস্ত প্রশাসনিক বোঝা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিয়ে শুধুমাত্র পাঠদানে নিয়োজিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য শুধুমাত্র থিওরি ক্লাসের বদলে ‘প্র্যাকটিস-বেসড’ মেন্টরশিপ চালু করার কথা বলা হয়েছে, যাতে তারা ক্লাসরুমে আরও আধুনিক এবং কার্যকরী উপায়ে শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন।
শিক্ষার মানের এই দৈন্যদশা কাটাতে ‘টিচিং অ্যাট দ্য রাইট লেভেল’ (TaRL) বা সঠিক স্তরে পাঠদানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তুমি দেখবে, আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী চতুর্থ শ্রেণিতে উঠলে তাকে চতুর্থ শ্রেণির বই-ই পড়তে হয়, যদিও সে হয়তো দ্বিতীয় শ্রেণির ভাষাও ঠিকমতো বোঝে না। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে নীতি আয়োগ বলছে, শিক্ষার্থীর বয়স বা ক্লাস অনুযায়ী নয়, বরং তার মেধা ও শেখার স্তরের ভিত্তিতে তাকে গ্রুপ করে পড়াতে হবে।
এটি মূলত পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়। যদি একজন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাধারণ গুণ বা ভাগ না পারে, তবে তাকে আগে সেই বুনিয়াদি শিক্ষা দিতে হবে, তবেই সে ভবিষ্যতের জটিল সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে।
২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা কেবল জিডিপি (GDP) বা হাইওয়ের দৈর্ঘ্য দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। তুমি যদি লক্ষ্য করো, তবে দেখবে যে বিশ্বের প্রতিটি উন্নত দেশ তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। ভারতের এই বিশাল ছাত্রশক্তি যদি সঠিক মানের শিক্ষা না পায়, তবে আমাদের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অচিরেই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার’-এ পরিণত হবে।
ডিজিটাল বিভাজন দূর করা, স্কুলগুলোকে একীভূত করে আধুনিক সম্পদে সাজিয়ে তোলা এবং শিক্ষকদের যোগ্যতাকে বিশ্বমানে উন্নীত করাই এখন একমাত্র পথ। এই পথটি হয়তো কঠিন এবং দীর্ঘ, কিন্তু আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এই কঠোর সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। ভারতের প্রতিটি শিশুর জন্য সমমানের এবং গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার।


