বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা:
চিটফাণ্ড কেলেঙ্কারিতে মা সারদার নাম জড়িয়ে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করার অধ্যায় এরাজ্য আগেই দেখেছে। এবার খোদ স্বামী বিবেকানন্দের পবিত্র নাম ভাঙিয়ে হাসপাতালের ঠিকা কর্মী নিয়োগে কোটি কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতি ও দালাল চক্র চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠল চিত্তরঞ্জন জাতীয় আঞ্চলিক ক্যান্সার হাসপাতাল (CNCI) কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগের তির হাসপাতালের বিতর্কিত অধিকর্তা ডাঃ জয়ন্ত চক্রবর্তী, রাজ্য প্রশাসনের প্রভাবশালী আইএএস (IAS) অফিসার নারায়ণস্বরূপ নিগম এবং কালীঘাটের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূলের এক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যের দিকে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি (ED) এই বিষয়ে অতীতে সরব হলেও, এক অজানা রহস্যময় কারণে গোটা বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ।
আরও পড়ুনঃ হরিশ মুখার্জি রোড টু ঠাকুরপুকুর! গভীর সংকটের মুখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
যোগ্যতাহীন অধিকর্তার ‘বর্ণবিদ্বেষ’ ও একচেটিয়া রাজত্ব
অভিযোগ উঠেছে, আবশ্যিক যোগ্যতা ছাড়াই চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট (৩৭, এসপি মুখার্জি রোড, কলকাতা-২৬)-এর অধিকর্তা পদে বসে রয়েছেন ডাঃ জয়ন্ত চক্রবর্তী। হাসপাতালের অন্দরের সূত্রেরই দাবি, নিজের চেয়ার বাঁচাতে প্রাক্তন শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের চাটুকারিতা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই রাজ্যের আদি অধিবাসীদের (ভূমিপুত্র) বঞ্চিত করে নিয়োগের ক্ষেত্রে এক বিশেষ অংশের মানুষদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যা কার্যত একপ্রকার ‘বর্ণবিদ্বেষী’ মানসিকতার শামিল। এই হাসপাতালের দুই ক্যাম্পাস মিলিয়ে যেখানে সর্বোচ্চ ৫০ জন ঠিকা কর্মী নিয়োগের পরিকাঠামো রয়েছে, সেখানে সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রায় ৩০০ জন ঠিকা কর্মী নিয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছেন এই অধিকর্তা। আর এই কর্মীদের প্রায় ১০০ শতাংশই একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের।
‘মেসার্স বিবেক’ এবং কালীঘাট কানেকশন: ৫০ জনের নিয়মে ৩০০ কর্মী!
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ঠিকাদার সংস্থা নির্দিষ্ট নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত কর্মী সরবরাহ করতে পারে না। কিন্তু CNCI-তে জاليةতির জাল বিছিয়েছে ‘মেসার্স বিবেক’ (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: KoL01/CLR/001152) নামক একটি তথাকথিত সমাজসেবী সংস্থা বা কোম্পানি। যার ঠিকানা— ৫২এ কালীঘাট রোড, কলকাতা-২৬ (কেএমসি ওয়ার্ড-৭৩)।

অভিযোগ, এই সংস্থার আসল মালিক কালীঘাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল পরিবারেরই এক অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য। এই ‘মেসার্স বিবেক’-কে অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিতেই হাসপাতালের প্রথম ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাস মিলিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ৩০০ জন ঠিকা কর্মী নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকের সংখ্যায় ব্যাপক কারসাজি করে, সরকারি তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে এবং শ্রমিকদের কার্যত নিজেদের ‘পোষ্য’ হিসেবে ব্যবহার করছে এই প্রভাবশালী চক্র।
আরও পড়ুনঃ যুক্তরাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র তুষার কুমার
আইএএস অফিসারের ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন: ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র চেষ্টা?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রাজ্যের একাধিক সরকারি হাসপাতালে এই ‘মেসার্স বিবেক’ নামক সংস্থাটি বছরের পর বছর ধরে একচেটিয়াভাবে ঠিকা কর্মী সরবরাহ করে চলেছে। অথচ প্রশাসনের শীর্ষ পদে থাকা আইএএস অফিসার নারায়ণস্বরূপ নিগম এই বিষয়ে সম্পূর্ণ ‘অজ্ঞতা’ প্রকাশ করেছেন। ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, স্বাস্থ্য দপ্তরের নাকের ডগায় বসে স্বামী বিবেকানন্দের নাম ব্যবহার করে কীভাবে এই বিশাল দালাল চক্র ও কোটি কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতি চলল? এই আইএএস অফিসার কি সত্যিই কিছু জানেন না, নাকি প্রাক্তন শাসকদলের প্রভাবশালী যোগ থাকার কারণে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি?
বিবেকানন্দের আদর্শের রাজ্যে তাঁরই নাম ভাঙিয়ে প্রাক্তন শাসকদলের মদতে এই ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক লুট এবং নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে উঠেছে। ইডি-র নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রশাসনের নীরবতা এই জল্পনাকে আরও উস্কে দিচ্ছে যে, দুর্নীতির শিকড় কালীঘাটের অনেক গভীরে প্রোথিত ছিল।



