পাহাড়ের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও চরম নাটকীয় মোড় এল। গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ-এর চিফ এগজিকিউটিভের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন হেভিওয়েট নেতা অনীত থাপা। বুধবার নিজের আকস্মিক পদত্যাগের কথা ঘোষণা করে তিনি সুকৌশলে পাহাড় সমস্যার সমাধানের পুরো বল ঠেলে দিলেন বিজেপির কোর্টে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাহাড়ের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিসরে এক মস্ত বড় রদবদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠল। অনীত থাপার এই ইস্তফা দেওয়ার ঠিক দু’দিনের মাথায় তাঁর দল ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চাতেও এক বিরাট ধস নামল। আজ, শুক্রবার দলের সমস্ত পদ থেকে একসঙ্গে পদত্যাগ করলেন ১২ জন জিটিএ সভাসদ। ঘটনাচক্রে, যখন কার্শিয়াঙে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সমস্ত শাখা সংগঠনকে নিয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছিলেন অনীত থাপা, ঠিক তখনই এই ১২ জন সদস্যের দলত্যাগের খবর আসে এবং এই আকস্মিক ধাক্কায় পাহাড়ি রাজনীতিতে অনীতের একাধিপত্য চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেল।
আরও পড়ুনঃ ‘চেয়ারপার্সন’ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ পর্ণা ঘোষ
গত বুধবার জিটিএ-র প্রধান পদ এবং সভাসদ পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর অনীত থাপা দলের বাকি সভাসদদের কাছেও পদত্যাগের আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে গত দু’দিনে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিগতভাবে পদত্যাগ করলেও শুক্রবারের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনীত থাপার এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত রাজনৈতিক সমস্যাই মূল চালিকাশক্তি, তা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। ইস্তফা দেওয়ার পর অনীত জানিয়েছেন, জিটিএ থাকা সত্ত্বেও পাহাড়ের মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছিল না। বিধানসভা নির্বাচনে পাহাড়ের মানুষ যেভাবে বিজেপিকে বিপুল জনরায় দিয়েছে, তাতেই স্পষ্ট যে তারা পাহাড় সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী এবং রাজনৈতিক সমাধান চায়। তাঁর কথায়, পূর্বতন রাজ্য সরকারও জিটিএতে দুর্নীতি নিয়ে প্রচুর কথা বলেছে। অনীতের দাবি, চেয়ারের প্রতি তাঁর কোনো মোহ নেই, বরং জিটিএ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি এবার স্থায়ী সমাধানের পথ প্রশস্ত করতে চাইছেন।
অনীত থাপার পর এবার সেই পথেই হেঁটে ইস্তফার কথা ঘোষণা করলেন জিটিএ-র ডেপুটি চিফ এগজিকিউটিভ সঞ্চবির সুব্বাও। পাশাপাশি পদত্যাগ করেছেন কার্সিয়াং পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অনু ছেত্রী। নিজের ইস্তফা প্রসঙ্গে অনু ছেত্রী বলেন, রাজ্যের নতুন সরকারের ওপর পাহাড়ের মানুষের আস্থা রয়েছে। এবার ডাবল ইঞ্জিন সরকারের হাত ধরে পাহাড় সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছেন সকলে, আমিও পাহাড় সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই, তাই ইস্তফা দিলাম। উল্লেখ্য, দীর্ঘ দুই দশক পরে ২০২৩ সালে পাহাড়ে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ফিরেছিল এবং সিংহভাগ পঞ্চায়েত সমিতি ও গ্রাম পঞ্চায়েত বর্তমানে অনীত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার দখলেই রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ থানা ঘেরাও, হামলার চেষ্টা! ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গিরের স্ত্রীও গ্রেফতার
২০২২ সালে জিটিএর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল অনীত থাপার দল। কিন্তু পাহাড়ের উন্নয়নে এই চার বছরে পূর্বতন রাজ্য সরকারের কাছে সেভাবে কোনো আর্থিক সাহায্য পায়নি জিটিএ, ফলে মানুষের আশা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি তারা। রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদলের পর থেকে জিটিএকে এড়িয়ে রাজ্য সরকার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাহাড় সফরে সরকারি কর্মসূচিতেও জিটিএ চিফ অনীত থাপা বা অন্য কোনও আধিকারিক ডাক পাননি। এরপরই অনীতের ইস্তফার সিদ্ধান্ত কার্যত বিজেপির কোর্টে বল ঠেলে দিল, ফলে পাহাড় সমস্যা মোতে এখন বিজেপি কী পদক্ষেপ করবে সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের মানুষ ও রাজনৈতিক মহল।


