১২৯ বছর। ২০০ বছর নয়।
ভারতের ইতিহাসের ব্রিটিশদের সবচেয়ে সফল গুজবগুলোর একটা হলো— “ইংরেজরা ২০০ বছর ভারত শাসন করেছে।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। এটা গুজবই !
শুনতে শুনতে আমরা সত্যি ভেবে নিয়েছি। কখনো হিসেব করিনি, সত্যিই কি তাই?
আমরা সব দিনই খুব গোপালের মতো সুবোধ বালক !! যে যা বলে, মেনে নিই…
যেমন এখন আমরা প্রায়ই মেনে নিয়েছি— সোনিয়া গান্ধী ভারতকে খুব ভালোবাসেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু চোখ দেখাতে
বিদেশ যান।
রাহুল গান্ধী শুধু সমুদ্রে স্নান করতে ব্যাংকক যান।
একমাত্র সিপিআই(এম)-ই পারে দেশকে ঠিকঠাকভাবে চালাতে।
লালু প্রসাদের চারা শুধু গরুই খেতো……
অখিলেশ যাদব টোঁটি চুরি করেনি।
তৃণমূল মানেই দুর্নীতিহীন দল…..
মমতা মানেই সততা !
সোনম ওয়াংচুক মস্ত বড়ো বিজ্ঞানী…..
আর শ্রীলেখা মিত্র জেন জি !!
তেমনি আমার যেন মনে হয়, ব্রিটিশরা ঠিক ২০০ বছর ভারত শাসন করেছে—এই কথাটা ঐতিহাসিকভাবে সরলীকৃত। আমরা যদি British Paramountcy-র সময় ধরি, তাহলে সেই সময়কাল ১২৯ বছর…..১৮১৮ থেকে ১৯৪৭ !!
আরও পড়ুনঃ ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা, উল্টে ডুবে গেল জলযান
অথচ অঙ্কটা ঠিক মতো মেলে না।
আপনি বলবেন, ১৭৫৭— পলাশী থেকে বৃটিশ শাসনের শুরু।
আজ্ঞে না। পলাশীর পরেও বহু বছর নবাবরাই শাসনে ছিলেন।
কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি পেল ১৭৬৫ সালে। সেটাই হলো লুটের বাক্স ছেড়ে খাতা-কলমে শাসন শুরুর প্রথম দিন।
কিন্তু ১৭৬৫-তেও ব্রিটিশরা গোটা ভারতের মালিক ছিল না। তখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মারাঠা, লড়ে যাচ্ছে মহীশূর, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে শিখ সাম্রাজ্য।
তাহলে গোটা ভারতে ব্রিটিশদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয় কবে?
আমার মতে, তৃতীয় মারাঠা যুদ্ধে মারাঠাদের পরাজয়ের পর, ১৮১৮ সালে।
এরপর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই ভারতের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। বহু দেশীয় রাজ্য টিকে থাকলেও তারা কার্যত British Paramountcy মেনে চলতে বাধ্য হয়।
তারপর আসে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ। বিদ্রোহ দমন করার পর ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে, এত বড় দেশ একটি বাণিজ্যিক কোম্পানির হাতে শাসন করানো ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ১৮৫৮ সালের Government of India Act-এর মাধ্যমে ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
গভর্নর-জেনারেল চার্লস ক্যানিং-ই ভারতের প্রথম ভাইসরয় হন এবং সেখান থেকেই শুরু হয় সরাসরি ব্রিটিশ রাজ।
অর্থাৎ, ১৮১৮ সালের পর প্রতিষ্ঠিত British Paramountcy ১৮৫৮ সাল থেকে সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউনের অধীনে পরিচালিত হতে থাকে।
তাহলে হিসেবটা কী দাঁড়ালো?
১৮১৮–১৮৫৮ = ৪০ বছর কোম্পানির রাজ। ১৮৫৮–১৯৪৭ = ৮৯ বছর ব্রিটিশ রাজ। মোট = ১২৯ বছর।
আমি এখানে ১৮১৮ সালে British Paramountcy প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে হিসাব করছি।
আপনি ১৭৬৫ ধরুন বা ১৮১৮— কোনো হিসেবেই ২০০ বছর হয় না।
যেমন আমি আমার আগের একটি পোস্টে বলেছিলাম, সুলতান-মুঘলরা ৮০০ বছর ভারত শাসন করেছে— যেটা সম্পূর্ন ভুল আসলে সেটা ৬৫০ বছর।
তেমনি ইংরেজদের “২০০ বছর ভারত শাসন ও একটা সুন্দর করে ছড়ানো গুজব।
ইতিহাসের একটাই নীতি হওয়া উচিত— যেটা যত, সেটাকে ততই বলো। কিন্তু আমাদের যত্ন করে চিনি দিয়ে মুড়ে খাওয়ানো হয়েছে ব্রিটিশরা আমাদের ২০০ বছর শাসন করেছিল।
সেই মহামান্য ব্রিটিশ রাজের, যার সূর্য নাকি কখনো অস্ত যেতোনা, সেই দেশটি এখন নিজের দ্বীপের মধ্যেই কুঁকড়ে গেছে, আমেরিকার হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলানো ছাড়া আর কোন এজেন্ডা নেই….. নাভিশ্বাস উঠেছে অরিজিনাল ব্রিটিশদের…..পাকিস্তানি, বাংলাদেশি ও অন্যান্য মুসলিমদের আগ্রাসনে, গ্রুমিং গ্যাংয়ের দৌরাত্মে নিজেই এরা নিজভূমে পরবাসী হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
ওই যাকে বলে, They have been paid back in their own coin.
কিন্তু…
এই ১২৯ হোক বা ২০০— এইটুকু সময়েই ওরা যে ক্ষতিটা করে গেছে, আমরা আজও তার সুদ গুনছি।
ওরা শুধু ধন সম্পদ লুটে নিয়ে যায়নি। ওরা আমাদের মেরুদণ্ডটাও ভেঙে দিয়ে গেছে।
লর্ড মেকলের বুদ্ধিতে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা বানানো হয়েছিল, যার একটা উদ্দেশ্য ছিল মানুষ তৈরি করা নয়, কেরানি তৈরি করা। এমন এক শ্রেণি, যারা রক্তে ভারতীয়, কিন্তু মনে-প্রাণে সাহেবের চাকর।
নিজের ধর্ম, নিজের ইতিহাসকে ঘৃণা করা আর সাহেব যা বলে, সেটাকেই বেদবাক্য মনে করা— এই মানসিক দাসত্বটা আজও পুরোপুরি যায়নি। Colonial Hangover এখনও কাটেনি।
আরও পড়ুনঃ পাকিস্তানি বর চান ‘দেশভক্ত’ ‘কট্টর হিন্দু’ কঙ্গনা!
তার মধ্যে আরেকটা সবচেয়ে বিষাক্ত বীজটা হলো Divide and Rule…….
ওরা বুঝেছিল, ঐক্যবদ্ধ ভারতকে শাসন করা অসম্ভব। ভাঙা ভারতকে শাসন করা সহজ।
তাই হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনকে ওরা পরিকল্পিতভাবে একটি গভীর ও রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছিল। আলাদা ভোট, আলাদা প্রতিনিধিত্ব, আলাদা খাতির— সবই ছিল Divide and Rule নীতির অংশ।
দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু ওদের বানানো সেই বিভাজনের ফর্মুলাটা আজও চলছে।
তাই ব্রিটিশদের লিগ্যাসি মানে শুধু রেললাইন আর লাল বাড়ি নয়।
লিগ্যাসি মানে— অর্থনৈতিক লুট, মানসিক গোলামি আর বিভাজনের বিষ।
ব্রিটিশরা ভারত ছেড়েছে।
কিন্তু ঔপনিবেশিকতা ছাড়েনি।
কলোনিয়াল হ্যাং ওভার আমাদের কাটেনি…..
আর হ্যাঁ।
ইতিহাসে আবেগও থাক আর অঙ্কের সত্যটাও থাক।
যেটা ১২৯, সেটা ১২৯….
২০০ কখনো নয়…!!


