বিশেষ আবহাওয়া ও পরিবেশ প্রতিবেদন, কলকাতা:
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনবহুল এলাকা গাঙ্গেয় বদ্বীপ (Gangetic Delta)—যা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত, বর্তমানে এক বড়সড় প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক আবহাওয়াবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ এবং কৃত্রিম উপগ্রহের ডেটা অনুযায়ী, বিগত দুই দশকে এই অঞ্চলে মেঘ থেকে সরাসরি মাটিতে আছড়ে পড়া (Cloud-to-Ground) বজ্রপাতের সংখ্যা প্রতি বছর প্রায় ১৫% থেকে ২০% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ খেতমজুর ও কৃষকদের মধ্যে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই উদ্বেগের মাঝেই আঞ্চলিক আবহাওয়া কেন্দ্র (RMC Kolkata) আজ, ৮ সেপ্টেম্বর বিশেষ বুলেটিন জারি করে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ সহ ভারী বৃষ্টির চরম সতর্কতা জারি করেছে।
আরও পড়ুনঃ শরীরের কোনো অস্বাভাবিকতা নয়, অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বয়ংক্রিয় একটি জৈবিক প্রক্রিয়া
গাঙ্গেয় অববাহিকায় অতিরিক্ত বাজ পড়ার ৪টি বৈজ্ঞানিক কারণ
পরিবেশবিদদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কারণেই গাঙ্গেয় বদ্বীপ আজ দেশের প্রধান ‘লাইটনিং হটস্পট’:
| বৈজ্ঞানিক কারণ | শারীরবৃত্তীয় ও পরিবেশগত ব্যাখ্যা |
| বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (Global Warming) | বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা ৭% বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিশাল আকৃতির ঘন ‘কুমুলোনিম্বাস’ (Cumulonimbus) বজ্রমেঘ তৈরি হচ্ছে। |
| বিপরীতমুখী বাতাসের সংঘাত | বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ-আর্দ্র বাতাস এবং উত্তর-পশ্চিমের শুষ্ক বাতাসের সংঘর্ষে মেঘের ভেতরের জল ও বরফকণার প্রচণ্ড ঘর্ষণে উচ্চমাত্রার ইলেকট্রিক চার্জ তৈরি হয়। |
| অ্যারোসল ও বায়ুদূষণ | শিল্পকারখানা ও যানবাহনের অতিরিক্ত ধোঁয়ায় বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র অ্যারোসল কণা মেঘের জলকণাকে ঘনীভূত করে চার্জের তীব্রতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। |
| প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক লোপ | গ্রামবাংলা থেকে উচ্চকায় তালগাছ, বট ও অশ্বত্থ কেটে ফেলার ফলে উন্মুক্ত মাঠে কাজ করা মানুষের ওপর সরাসরি বিদ্যুৎপাত ঘটছে। |
৮ সেপ্টেম্বরের আবহাওয়া রাডার ও ‘Nowcast’: জেলায় জেলায় বজ্রবৃষ্টির সতর্কতা
৮ সেপ্টেম্বরের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলে তীব্র অস্থিরতার কারণে আজ ও আগামীকাল পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু জেলায় ৭ থেকে ১১ সেমি পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
-
দক্ষিণবঙ্গের পরিস্থিতি: পূর্ব বর্ধমান, হুগলি ও বাঁকুড়ায় বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টি (Isolated Heavy Rain) হতে পারে। সেই সঙ্গে জেলাগুলিতে বজ্রবিদ্যুৎ সহ ঘণ্টায় ৩০-৪০ কিমি বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে।
-
উত্তরবঙ্গের সতর্কতা: জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি করা হয়েছে।
রাডার চিত্রে সক্রিয় বৃষ্টি ও বজ্রপাতের অঞ্চলসমূহ:
-
মুর্শিদাবাদ: বহরমপুর–জঙ্গিপুর বেল্ট।
-
নদিয়া: কৃষ্ণনগর–শান্তিপুর বেল্ট।
-
বীরভূম: সাঁইথিয়া–বোলপুর সংলগ্ন অঞ্চল।
-
পূর্ব বর্ধমান: বর্ধমান সেক্টর।
-
উত্তর ২৪ পরগনা ও কলকাতা: সংলগ্ন এলাকায় দ্রুত বদলাচ্ছে মেয়ারি সেল, বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রবল।
আরও পড়ুনঃ কোথায় পাচ্ছে কলকাতার মানুষ এত টাকা? কম বার্ষিক আয়েও বাজার ধরে রেখেছে কলকাতা
জরুরি সুরক্ষাবিধি ও আগাম সতর্কতা
বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আবহাওয়া দপ্তর ও বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষকে ‘দামিনী’ (Damini App) মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন—যা আধা ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। বজ্রবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিলে ফাঁকা মাঠ, জলাশয় ও গাছের নিচে আশ্রয় না নিয়ে অবিলম্বে পাকা বাড়ির ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


