বিশেষ আধ্যাত্মিক ও ঐতিহ্য সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন:
পৌরাণিক কথন ও তন্ত্রশাস্ত্রের সুগভীর তত্ত্বে দেবী সতীকে কেন্দ্র করে মহাদেবের প্রলয়ঙ্কর তাণ্ডব এবং তা শান্ত করার পৌরাণিক প্রেক্ষাপট ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাধনার এক অন্যতম ভিত্তি। আর এই আখ্যানের ওপর ভিত্তি করেই ভারতীয় তন্ত্রসাধনায় গড়ে উঠেছে উপাসনা ও বিগ্রহ নির্মাণের দুটি প্রধান ধারা—‘আগম’ এবং ‘নিগম’। প্রচলিত জনপ্রিয় ধারার বাইরে গিয়ে নিগম তন্ত্র মতে মহাকালের যে বিশেষ রূপের পুজো উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রচলিত রয়েছে, তার দার্শনিক ও ভৌগোলিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।
১. পৌরাণিক প্রেক্ষাপট ও তন্ত্রের উৎপত্তি
-
সতীর দেহত্যাগ ও মহাদেবের তাণ্ডব: পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে মহাদেবের তাণ্ডবকালে জগৎকে রক্ষা করতে ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করেন। কিন্তু এতে মহাদেবের ক্রোধ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
-
মহাকালীর শান্ত করার প্রয়াস: ক্রুদ্ধ মহাদেবকে শান্ত করতে না পেরে পরিশেষে মহাকালী তাঁর পথ আগলে শুয়ে পড়েন। মহাদেবের পদযুগল যেই মাত্র মহাকালীর ওপরে স্পর্শ করে, অমনি তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হয়। এই শিব ও সতীর অন্তর্নিহিত কথোপকথন এবং তত্ত্ব থেকেই মূলত ‘তন্ত্র’ তথা উপাসনা ও সাধনপদ্ধতির বিকাশ ঘটেছে।
২. তন্ত্রশাস্ত্রের দুই ধারা: আগম বনাম নিগম
কুণ্ডলিনী ও তন্ত্রশাস্ত্রের মূল দুটি ধারা রয়েছে, যেগুলির রূপায়ণ সরাসরি প্রভাব ফেলে দেব-দেবীর বিগ্রহ গঠনে:
-
আগম তন্ত্র (সক্রিয় প্রকৃতি, নিষ্ক্রিয় পুরুষ): আমরা সচরাচর যে মা কালীর পূজা করে থাকি, তা আগম তন্ত্র মতে নির্মিত। এই ধারায় নারী শক্তি বা প্রকৃতি সক্রিয় এবং পুরুষ (শিব) নিষ্ক্রিয়। সর্বজনবিদিত মহাকালী ও মহাকালের মূর্তিতে মহাদেবীকেই দেবাদিদেবের বক্ষে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
-
নিগম তন্ত্র (সক্রিয় পুরুষ, নিষ্ক্রিয় প্রকৃতি): এর ঠিক বিপরীত ধারা হলো ‘নিগম’, যেখানে পুরুষ তথা শিব সক্রিয় এবং প্রকৃতি নিষ্ক্রিয়। জাগতিক নারী ও পুরুষের তারতম্যের এই তত্ত্বে পুরুষ যে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তা ফুটিয়ে তোলা হয়। এই কারণে নিগম তন্ত্র মতে বানানো মহাকালের বিগ্রহে প্রকৃতির (দেবী) বুকে পুরুষ (মহাকাল) পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
আরও পড়ুনঃ ডাকাত আতঙ্ক থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি
৩. মহাকালের সাকার রূপ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের উপাসনা
-
সময় নিয়ন্ত্রণ ও মোক্ষ দান: যখন মহাকাল ‘কাল’কে কলন করেন—অর্থাৎ সময়কে গ্রহণ বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন দেবী তাঁর পদতলে শায়িত থাকেন। এই রূপ অনুযায়ী, মহাকাল হলেন মোক্ষ প্রদানকারী এবং তাঁর শক্তি তথা দেবী কালী ভক্তদের সকল মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন।
-
ভৌগোলিক বিস্তার: প্রচলিত আগম ধারার বিপরীতে এই নিগম তন্ত্র মতে মহাকালের সাকার রূপের উপাসনা সচরাচর সব জায়গায় দেখা যায় না। উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল, যেমন—শিলং, লামডিং, ইটানগর, শিলচর প্রভৃতির মতো স্থানে এই বিশেষ বিগ্রহের আরাধনা ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির প্রচলন রয়েছে।


