Monday, 2 November, 2026
2 November
HomeকলকাতাKolkata: শ্মশানের পোড়া কাঠ, নরমুণ্ড ও পঞ্চমুন্ডির আসনের রহস্যাবৃত গর্ভগৃহের ভয় ও...

Kolkata: শ্মশানের পোড়া কাঠ, নরমুণ্ড ও পঞ্চমুন্ডির আসনের রহস্যাবৃত গর্ভগৃহের ভয় ও ভক্তির অনন্য আধ্যাত্মিক দুনিয়া! উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়ার তারাশঙ্করী পীঠ

অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে স্থিমিত আলোয় দেবী মূর্তির দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে। দেবী এখানে শিবের ওপর শায়িতা।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

বিশেষ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক প্রতিবেদন:

তিলোত্তমা কলকাতার বুকেই লুকিয়ে রয়েছে এমন কিছু প্রাচীন ও রহস্যে মোড়া স্থান, যা সাধারণ কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক অন্য জগতের সন্ধান দেয়। দক্ষিণ কোলাহল পেরিয়ে উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়া অঞ্চলের অন্দরে, মেট্রো স্টেশনের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে কুণ্ডু লেনের বেলগাছিয়া ভিলার ঠিক পরেই অবস্থিত এমনি এক রহস্যময় ও তান্ত্রিক আরাধনার ক্ষেত্র—তারাশঙ্করী পীঠ। তন্ত্রসাধনা, ভীতিপ্রদ পরিবেশ এবং পরাবাস্তব বিশ্বাসের এক অপরূপ মেলবন্ধন এই মন্দির।

আরও পড়ুনঃ দেবীর আরাধনা ‘বিয়ে’র নিয়মে!! শান্তিপুরের জাগ্রত ‘মা মহিষখাগী’র অজানা গল্প

১. স্থাপত্য ও প্রতিষ্ঠাতা: প্রবেশপথ থেকে যশমাধবের রথ

বেলগাছিয়ার এই সুবিশাল মন্দিরের গঠনশৈলী ও বিগ্রহের বিন্যাস অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও আলাদা ধরনের।

  • শিবলিঙ্গাকৃতি চূড়া: এই মন্দিরের মূল চূড়াটি প্রচলিত মন্দিরগুলির মতো নয়, বরং তা অবিকল একটি বিশাল শিবলিঙ্গের আকারে তৈরি করা হয়েছে।

  • প্রবেশপথ ও সমাধি: কারুকার্যমণ্ডিত প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই ডান চোখে পড়ে বিখ্যাত যশমাধবের রথ। আর প্রবেশপথের ঠিক পাশেই রয়েছে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী পরেশচন্দ্র রায়মৌলিক এবং তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী অঞ্জলি রায়মৌলিকের সমাধি মন্দির, যা এই স্থানটিকে এক পবিত্র স্মৃতির মোড়কে মুড়ে রেখেছে।

  • বিগ্রহের সহাবস্থান: এই মন্দিরে প্রধানত দেবী উগ্রতারা, যশমাধব এবং কালভৈরবের যুগপৎ মূর্তি দেখা যায়।

২. গর্ভগৃহের অন্দরমহল: আধো-আঁধার, নরমুণ্ড ও ভীতিপ্রদ পরিবেশ

সামনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই মূল গর্ভগৃহের দেখা মেলে। এখানকার অন্দরসজ্জা ও পরিবেশ যেকোনো প্রথম দর্শনার্থীর মনে একটা গা-ছমছমে ও ভয়মিশ্রিত বিস্ময় তৈরি করে।

  • অগ্নিসংযোগ ও কঙ্কালসার দৃশ্য: গর্ভগৃহের ভেতরে শ্মশানের পোড়া কাঠে সারাক্ষণ আগুন জ্বলতে থাকে। গর্ভগৃহের বাঁ দিক থেকে ডান দিক জুড়ে দেবীর সামনে ঝুলতে থাকে মড়ার মাথার খুলি, নরমুণ্ড ও বিভিন্ন মানুষের হাড়। এছাড়া রয়েছে একটি বিশাল উঁচু বেদি, যার ওপর খাড়া করা ত্রিশূল; আর সেই ত্রিশূলে গেঁথে রয়েছে রুদ্রাক্ষ, একটি সাদা শিবলিঙ্গ এবং ফণা তোলা ধাতব সাপ।

  • দর্শনের নিয়ম: সাধারণত সাধারণের জন্য এই গর্ভগৃহে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে দরজার সামনে দাঁড়িয়েই দেবীকে দর্শন করা যায়। একমাত্র কালীপুজোর দিন এবং বিশেষ কার্তিকী অমাবস্যায় এখানে গর্ভগৃহে প্রবেশের অনুমতি মেলে।

  • দেবী তারাশঙ্করীর রূপ: প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে স্থিমিত আলোয় দেবী মূর্তির দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে। দেবী এখানে শিবের ওপর শায়িতা। তাঁর গোলাকার উগ্র চোখের চাহনি, মাথার রুপোর মুকুটে সাপের প্রতিকৃতি, প্রকট ও রক্তস্নাত দাঁত, ডান হাতে খাঁড়া-কাটারি এবং বাঁ হাতে রুপোর নরমুণ্ড ও বরাভয় মুদ্রা—সব মিলিয়ে এক ভয়াল অথচ দিব্যরূপ ফুটিয়ে তোলে। দেবীর পেছনের চালচিত্রটিকে দেখে মনে হয় যেন লেলিহান শিখায় আগুন জ্বলছে। গর্ভগৃহের বাইরের দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে দশমহাবিদ্যার রূপ।

আরও পড়ুনঃ  উত্তরবঙ্গের দুর্গম পথের রহস্যময় আস্থার প্রতীক; তিস্তার গর্জন ও ঘন পাহাড়ি জঙ্গলের আড়ালে ‘মা সেবকেশ্বরী’

৩. তন্ত্র সাধনার পরম রহস্য: ‘পঞ্চমুন্ডির আসন’ ও তার গোপনীয়তা

তন্ত্রে বিশ্বাসী সাধক ও গবেষকদের কাছে “পঞ্চমুন্ডির আসন” এক অপার রহস্য ও ভয়ের জায়গা। বিশ্বাস করা হয়, এই বিশেষ আসনের ওপর সাধনা করলে অলৌকিক শক্তির দেখা মেলে। কী এই পঞ্চমুন্ডি তৈরির গোপনীয়তা? তান্ত্রিক মতানুযায়ী, এই আসন গড়তে মোট পাঁচ প্রকার নির্দিষ্ট মাথার খুলি বা মুণ্ড প্রয়োজন হয়:

১. চাড়াল বা চণ্ডালের মাথা: যারা শ্মশানে মৃতদেহ দাহ করেন (ডোম সম্প্রদায়), তাঁদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি থাকে বলে তাঁদের মাথাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়।

২. বিষধর সাপের মাথা: কেউটে জাতীয় কোনো অত্যন্ত তীব্র বিষধর সাপের মাথা, কারণ সাপ স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত ক্রুর ও ভয়ানক।

৩. শেয়াল বা বেজির মাথা: শেয়াল অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির, আর বেজি সাপের চরম শত্রু এবং অত্যন্ত দ্রুতগামী।

৪. হনুমানের মাথা: পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী হনুমান ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

৫. অপঘাতে মৃত মানুষের মাথা: এই বিষয়ে তান্ত্রিকদের মধ্যে কিছুটা মতান্তর রয়েছে। কারও মতে সদ্যপ্রসূত মানুষের মাথা, কারও মতে কোনো দুর্ঘটনায় মৃত কুমারী তরুণীর মাথা, আবার কারও মতে যেকোনো অপঘাতে মৃত মানুষের মাথাই শ্রেয়।

  • শোধন ও প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া: এই পাঁচটি মাথা সংগ্রহ করার পর তা শোধন করতে হয়। তন্ত্রমতে, এক্ষেত্রে সাধারণ পুকুর বা নদীর জল (এমনকি গঙ্গাজলও নয়) চলে না; এর জন্য আদর্শ মাধ্যম হলো মদ্য (মদ)। এরপর সেগুলিকে ‘পঞ্চামৃত’ (দুধ, দই, ঘি, মধু ও মিষ্টি) দিয়ে পুনরায় শোধন করা হয়।

  • গোপন আচার: সমস্ত প্রক্রিয়াটি করতে হয় কোনো শনিবারের অমাবস্যার গভীর রাতে। নির্দিষ্ট স্থানে মাটিতে গর্ত করে এই পাঁচ মাথা চাপা দিয়ে তার ওপর সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে একটি বেদি তৈরি করা হয়।

এই বেদিতেই তান্ত্রিক সাধক বা সাধিকারা নিত্যদিন বসে সাধনা করেন এবং পঞ্চমুণ্ডির এই আসনকে সদা জাগিয়ে রাখতে হয়, নতুবা তা মৃত হয়ে যায় বলে বিশ্বাস। তান্ত্রিকদের দৃঢ় বিশ্বাস, নিখুঁত তন্ত্রমতে এই আসন জাগাতে পারলে অলৌকিক সিদ্ধি লাভ অবধারিত। আর ঠিক এইরকমই এক ভয়ংকর ও শক্তিশালী পঞ্চমুন্ডির আসনের ওপর অধিষ্ঠান করছেন মা তারাশঙ্করী। উত্তর কলকাতার বুকে আধুনিকতার ভিড়েও এই প্রাচীন ও রহস্যময় পীঠস্থানটি আজও তন্ত্র ও বিশ্বাসের এক অনন্য স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন