Sunday, 1 November, 2026
1 November
HomeকলকাতাAkash Pradip: নস্টালজিয়ার বাতিঘর! লুপ্তপ্রায় বাংলার আকাশ প্রদীপ

Akash Pradip: নস্টালজিয়ার বাতিঘর! লুপ্তপ্রায় বাংলার আকাশ প্রদীপ

আজ গ্রামবাংলায় সেই উঠোন বা বাঁশের খুঁটি বাঁধার জায়গা নেই, ফ্ল্যাটের কৃত্রিম ব্যালকনিতে আকাশ দেখার ফুরসতও সীমিত।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

হেমন্তের হিমেল পরশ, কার্তিকের কুয়াশায় মোড়া ধানখেত আর রাতের আকাশে তারাদের মিতালি—এই আবহমান বাংলার চিরচেনা রূপের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এক হারানো ঐতিহ্য—‘আকাশপ্রদীপ’। শহরের ঝলমলে নিয়ন বাতি ও আকাশচুম্বী বহুতলের ভিড়ে আজ এই প্রাচীন সংস্কৃতি চোখের আড়াল হতে বসলেও, এর শিকড়ে লুকিয়ে আছে গ্রামীণ বাংলার গভীর দর্শন, লোকায়ত বিজ্ঞান এবং এক অকৃত্রিম নস্টালজিয়া।

আরও পড়ুনঃ  ইন্টারনেট ছাড়াই রিচার্জের পথ খুলল জিও! স্বস্তি অ-ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের

১. কী এই আকাশপ্রদীপ? নামকরণের পেছনের রহস্য

আকাশপ্রদীপ কেবল কোনো সাধারণ প্রদীপ বা আলোর উৎস নয়; এটি মাটির মানুষকে মহাকাশের অসীমতার সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানোর এক নিঃশব্দ উপাসনা।

  • সময়কাল: আশ্বিন মাসের কোজাগরী লক্ষ্মীপূর্ণিমা থেকে শুরু করে পুরো কার্তিক মাসব্যাপী, অর্থাৎ কার্তিক পূর্ণিমা বা রাসপূর্ণিমা পর্যন্ত প্রতি সন্ধ্যায় এটি প্রজ্বলিত করা হতো।

  • প্রস্তুতি ও স্থাপন: উঠোনের এককোণে কিংবা তুলসীতলার পাশে লম্বা একটি বাঁশ পুঁতে তার মাথায় কপিকল বা কাছি বাঁধা হতো। এরপর মাটির সরা, ছিদ্রযুক্ত হাঁড়ি বা বাঁশের সূক্ষ্ম খাঁচার মধ্যে সর্ষের তেল বা ঘিয়ে ভেজানো প্রদীপ বসিয়ে দড়ির টানে তা তুলে দেওয়া হতো আকাশের ঠিক নিচে। মাটির মায়া ছেড়ে শূন্যে তারার পানে ঝুলে থাকত বলেই এর নাম হয়েছিল ‘আকাশপ্রদীপ’। বাতাসে যাতে শিখা নিভে না যায়, তাই মাটির পাত্র বা বাঁশের বোনা খাঁচার সুরক্ষাবলয় ব্যবহার করা হতো।

২. পৌরাণিক বিশ্বাস: পিতৃলোকের আলোর দিশা

এই প্রথা পালনের পেছনে জড়িয়ে আছে সনাতন ধর্মের এক অন্তহীন আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও সংস্কৃতি।

  • পিতৃপুরুষের পথচলা: মহালয়ার পুণ্যলগ্নে মর্ত্যে নেমে আসা পিতৃপুরুষের আত্মারা কার্তিকের অমাবস্যা পেরিয়ে আবার যখন অনন্ত আলয় বা পিতৃলোকে ফিরে যান, সেই দীর্ঘ ও শীতল পথ যাতে তাঁরা হারিয়ে না ফেলেন, তা আলোকিত করতেই প্রজ্বলিত হতো এই প্রদীপ।

  • দামোদর মাস ও শাস্ত্রীয় বিধান: কার্তিক মাস হলো বৈষ্ণব ভাবধারার ‘দামোদর মাস’। আকাশকে সাক্ষী রেখে শ্রীহরির প্রীতি কামনায় এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি ঋণস্বীকারের এই প্রথা যেন পরলোককে ভালোবাসার আলোয় ছোঁয়ারই এক শান্ত প্রয়াস। শাস্ত্রেও এর উল্লেখ রয়েছে—“উজ্জ্বলং জ্যোতিষামর্থং আকাশদীপমুৎসৃজেৎ॥”

৩. লোকায়ত বিজ্ঞান ও গ্রামবাংলার বাতিঘর

ধর্মীয় ভাবনার বাইরেও বাংলার গ্রামীণ জীবনে আকাশপ্রদীপের বহুমুখী ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

  • নিঃসঙ্গ বাতিঘর: রাতের অন্ধকারে পথঘাট যখন সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকত, তখন দূরদূরান্তর থেকে ঘরে ফেরা ক্লান্ত কৃষক কিংবা বিল-হাওরের বুক চিরে ফেরা মাঝিদের একমাত্র ভরসা ছিল এই সুউচ্চ আলো। কুয়াশা ভেদ করে জ্বলতে থাকা ওই শিখাটি বুঝিয়ে দিত—সংসার ও আপনজন বেশি দূরে নয়।

  • প্রাচীন আলোক-ফাঁদ (Light Trap): কার্তিক মানেই আমন ধানের শীষ বেরোনোর মরশুম। এই সময়ে ফসলের ক্ষতিকর পতঙ্গ বা পোকার উপদ্রব বাড়ত। রাতের আঁধারে উঁচু বাঁশের ডগায় প্রদীপের উজ্জ্বল আলো দেখে আকৃষ্ট হয়ে পোকার দল এসে পড়ত এবং প্রদীপের নিচে রাখা তেলের হাঁড়ি বা জলে পড়ে ধ্বংস হতো। আধুনিক বিজ্ঞান যাকে আজ ‘লাইট ট্র্যাপ’ বলে, তাকেই গ্রামীণ সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পালন করে এসেছে উৎসবের আমেজে।

আরও পড়ুনঃ  আস্থা দিল্লির; ‘সুপারস্পাই’ ডোভালের উত্তরসূরি রবি! বাংলায় নতুন ‘বিতর্কহীন’ রাজ্যপাল নিয়ে চর্চা

৪. আধুনিক বাংলা গানে আকাশপ্রদীপের সুর

বাঙালির এই আত্মিক সংস্কৃতি আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগেও অমর হয়ে রয়েছে। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুর ও পবিত্র মিত্রের কথায় লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে গাওয়া সেই চিরস্মরণীয় গান—

“আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে / আমার নয়ন দু’টি তোমারে শুধুই খোঁজে…”

এই গান শোনার পর আকাশপ্রদীপ কেবল বাঁশের ডগার একটি প্রদীপ থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রিয়ার পথ চেয়ে থাকা কিংবা দূরের তারার মতো হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রতি এক শাশ্বত ও আকুল আর্তি।

আজ গ্রামবাংলায় সেই উঠোন বা বাঁশের খুঁটি বাঁধার জায়গা নেই, ফ্ল্যাটের কৃত্রিম ব্যালকনিতে আকাশ দেখার ফুরসতও সীমিত। তবুও কার্তিকের নির্জন সন্ধ্যায় উত্তুরে বাতাসের ছোঁয়া লাগলে মনের গহীনে কোথাও যেন সেই টিমটিমে হলুদ শিখাটি আজও দুলে ওঠে—মনে করিয়ে দেয়, মাটির ধুলোয় দাঁড়িয়েও মানুষ একদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভালোবাসার আলো জ্বালানোর সাধনা জানত।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন