বিশেষ আধ্যাত্মিক ও কালচারাল ফিচার প্রতিবেদন:
“কে জানে রে কালী কেমন
ষড়দর্শনে না পায় দরশন…”
বাঙালি মানসে কালী সাধনা ও মূর্তিপূজার ইতিহাস অত্যন্ত সুপ্রাচীন ও অনুভূতিপ্রবণ। ভক্তের সঙ্গে মায়ের আত্মিক সম্পর্কের যে মেলবন্ধন আধুনিক বাংলায় দৃশ্যমান, তার নেপথ্যে রয়েছে তন্ত্রশাস্ত্রের পরিবর্তন ও বিবর্তনের এক অনন্য অধ্যায়। কথিত আছে, বঙ্গদেশে বর্তমানে প্রচলিত কালী মূর্তির প্রথম রূপদান করেছিলেন নবদ্বীপের প্রখ্যাত সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ।
আরও পড়ুনঃ তন্ত্রসাধনার দুই ধারা ও মহাকালের রূপভেদ; আগমের বিপরীত নিগম তন্ত্রে উত্তর-পূর্ব ভারতের অনন্য উপাসনা পদ্ধতি
১. মূর্তিপূজার পূর্বে দেবী উপাসনা ও আগমবাগীশের আকুলতা
-
ঘট ও যন্ত্রে পুজো: অতীতকালে বাংলায় প্রতিমা গড়ে কালীপুজোর ব্যাপক প্রচলন ছিল না। সে যুগে মূলত ঘট এবং তান্ত্রিক ‘যন্ত্রে’ই দেবীর আবাহন ও উপাসনা সম্পন্ন হতো।
-
সাধকের আকুলতা: শাস্ত্রে বর্ণিত মহাকালের সঙ্গে বিপরীত রতাতুরা উগ্রা কালীমূর্তি সাধারণ ভক্তদের পক্ষে অনুধাবন করা ছিল কঠিন। ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’-এর রচয়িতা ও পরম পণ্ডিত আগমবাগীশ মহাশয় এমন এক মাতৃরূপের সন্ধান করছিলেন, যিনি হবেন ঘরের খুব কাছের মানুষ—যাঁকে নিজ হাতে অন্ন ভোগ নিবেদন করা যাবে এবং পাশে বসিয়ে মনের আকুতি জানানো যাবে।
২. স্বপ্নাদেশ ও সাধারণ গোপবধূর রূপক থেকে দক্ষিণাকালী
আগমবাগীশের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে দেবী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন—পরদিন প্রত্যুষে ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি প্রথম যে নারীমূর্তি প্রত্যক্ষ করবেন, সেই রূপেই যেন দেবীকে গড়ে তোলেন।
-
ব্রাহ্মমুহূর্তের দৃশ্য: পরদিন ভোরে গঙ্গাস্নানে যাওয়ার পথে আগমবাগীশ এক কৃষ্ণবর্ণা গোপবধূকে দেখতে পান। তিনি ডান পা একটি টিলার ওপর রেখে দেওয়ালে ঘুঁটে দিচ্ছিলেন। তাঁর বাম হাতে গোবরের তাল এবং ডান হাতটি ঘুঁটে দেওয়ার জন্য ওপরের দিকে ওঠানো ছিল। মাথার ঘন চুল ছিল অবিন্যস্ত এবং কপালের সিঁদুর ধেবড়ে গিয়েছিল। কাকভোরে আচমকা পরপুরুষ কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় তিনি জিভ কেটে ফেলেন।
-
বিগ্রহের রূপান্তর: এই সাধারণ দৃশ্যকেই আগমবাগীশ তাঁর আরাধ্য দক্ষিণাকালীর মূর্ত রূপ হিসেবে গ্রহণ করেন:
-
গোপবধূর টিলার ওপর রাখা ডান পা রূপ পেল শবরূপী শিবের বক্ষস্থল হিসেবে।
-
গোবরের তাল ধরা বাম হাত হলো কর্তিত মুণ্ড।
-
ঘুঁটে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওঠানো ডান হাত পরিণত হলো অভয়মুদ্রায়।
-
লজ্জায় কাটানো জিভ হলো দেবীমূর্তির অন্যতম প্রধান চিহ্ন।
এইভাবে সাধক কৃষ্ণানন্দ আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে রূপ দিলেন মহাকালের ওপর দণ্ডায়মানা চতুর্ভূজা কালীর, যা পরবর্তীতে ‘বাংলার প্রথম দক্ষিণাকালী’ হিসেবে খ্যাত হয়।
-
আরও পড়ুনঃ মা কৃপাময়ী এবং দুই শিবলিঙ্গ-এর নামে পৃথক প্যান কার্ড! উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কাশীপুরের কৃপাময়ী কালীবাড়ি
৩. গবেষণার তথ্য ও ভাবময়ী শ্যামার প্রসার
-
ঐতিহাসিক তর্কসাপেক্ষতা: আধুনিক গবেষকদের মতে, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের আবির্ভাবের কয়েকশো বছর আগেও বিভিন্ন অঞ্চলে অনুরূপ কালীমূর্তির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ফলে তাঁর কল্পিত বিগ্রহটিই বাংলার প্রথম কালীমূর্তি কি না, তা ঐতিহাসিক দিক থেকে তর্কসাপেক্ষ।
-
বাঙালির আত্মিক বন্ধন: ইতিহাস নিয়ে যুক্তি-তর্ক থাকলেও এটি সর্বজনবিদিত যে, আগমবাগীশ নবদ্বীপের মাটিতে মাতৃরূপের যে সহজ-সরল ও ভাবময়ী আরাধনা শুরু করেছিলেন, পরবর্তীতে সেই কালীরূপই সাধক রামপ্রসাদের বেড়া বাঁধার অলৌকিক ঘটনায় ধরা দিয়েছে, সাধক কমলাকান্তের শ্যামাসংগীতে সুর হয়ে বেজেছে এবং পরবর্তীতে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের হাতে অন্ন ভোগ গ্রহণ করেছে।
বাঙালির শ্যামাসাধনায় কৃপণতাহীন ভালোবাসার যে ধারা আজও প্রবহমান, তার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল সাধক আগমবাগীশের সেই কালজয়ী ভাবনা।


