সুদিন চট্টোপাধ্যায়ঃ
১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি নতুন দিল্লির প্রাসাদোপম বিড়লা হাউসের সবুজ ঘাসে , ফোঁটা ফোঁটা রক্তের অক্ষরে লেখা হলো ভারত ইতিহাসের এক অন্তর্ভেদী আখ্যান। অহিংস ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ, উদার, মানবিক শরীর সেদিন শীতের গোধূলি আলো-আঁধারে বুলেটবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর নীরবতায় নিথর হয়ে গেলো।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি , ভারতীয় গণজাগরণের নেতা, যিনি অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনের শক্তিতে সাম্রাজ্যবাদী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের চূড়ান্ত অসহযোগিতা ও অবাধ্যতা ঘোষণা করে যুগান্তকারী ইতিহাস তৈরি করেন এবং এই নীতিকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম জোরদার চালিকা শক্তিতে পরিণত করেন। এভাবেই অহিংস সংগ্ৰামের দর্শন সারা বিশ্বের মানুষের স্বাধীনতা এবং স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
দিল্লিতে থাকলে গান্ধিজি সন্ধ্যায় বিড়লা ভবনের প্রশস্ত প্রাঙ্গণে প্রার্থনা সভা করতেন। এসময়ে তাঁর অনুগামীদের ভিড় জমে যেতো তাঁকে দেখার এবং তাঁর কথা শোনার জন্যে। ৪৮’র সেই শীত জড়ানো মলিন সন্ধ্যাতেও অন্যদিনের মতো তিনি যথাসময়ে প্রার্থনা সভাতেই আসছিলেন। কিন্তু প্রাঙ্গণে ঢোকার মুখেই সামনে থেকে সরাসরি মহাত্মার বুকে এবং পেটে তিনটি গুলি ছুঁড়েছিল আততায়ী। পাঁজরে গভীর ক্ষত ও রক্ত নিয়ে গান্ধিজি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে বিড়লা হাউসে তাঁর ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, কিছুক্ষণ পরে একজন প্রতিনিধি এসে তাঁর মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন।
হিন্দু মহাসভা সহ অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনোভাবেই অংশ গ্ৰহণ করেনি, পরন্তু ধর্ম ও জাতিবোধের অহঙ্কারে অবিরাম গান্ধিজির বিরুদ্ধে ঘৃণার প্রচার চালিয়ে গেছে। একই অন্যায় অপকর্ম করেছে মুসলিম লীগও। হিন্দুত্ববাদীদের মূল বক্তব্য ছিল দুটি, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় গান্ধিজি মুসলমানদের পক্ষে অন্যায়, অযৌক্তিক ওকালতি করে ভারতের হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। দ্বিতীয়, নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে তাদের প্রাপ্য অর্থ মিটিয়ে দেওয়ার পক্ষে বলে তিনি ভারতকে আর্থিক ভাবে দুর্বল করে আবারও হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার নজির তৈরি করলেন। অতএব কট্টর হিন্দুত্বের জল্লাদ অনুগামী নাথুরাম গডসে গুলি করে হত্যা করলো গান্ধিজিকে। তার সহযোগী ছিল নারায়ণ আপ্তে ।
মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মহাত্মার শেষ আর্ত উচ্চারণ ‘হে রাম’। মানুবেন গান্ধি লিখেছেন, “পিস্তলের আওয়াজ তাঁকে বধির করে দিয়েছিল, ধোঁয়া খুব ঘন ছিল, এবং ঘটনাটি ৩ থেকে ৪ মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। জনতার ভিড় তাঁদের দিকে ছুটে আসে। তিনি যে ঘড়িটি পরেছিলেন তাতে সময় দেখিয়েছিল সন্ধ্যা ৫:১৭।”
সেই সন্ধ্যায় অল ইণ্ডিয়া রেডিও থেকে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জাতির উদ্দেশ্যে ইংরেজি ভাষায় একটি তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ত ভাষণে বললেন “The light has gone out of our lives”. তিনি আরও বললেন অনির্বাণ এই আলোর শিখা, তাই এ আলো বারবার দেখা যাবে দুর্গত মানুষের হৃদয়ে সান্ত্বনার প্রদীপ হয়ে “That light will be seen …the world will see it and it will give solace to innumerable hearts.”
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্ৰামে গান্ধিজির আগমন, তাঁর অহিংসা ও অসহোযোগিতার রাজনীতি নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল, আজও আছে । রবীন্দ্রনাথও তাঁর সবকিছু মেনে নিতে পারেননি, কিন্তু যথার্থ মন্তব্য করেছিলেন যে তাঁর নৈতিক শক্তি ও মানবিকতাবোধের উচ্চতাকে মেনে নিতে না পারাটা “অন্ধত্ব”, “মহাত্মা গান্ধী অতি অল্পকালের মধ্যে সমস্ত ভারতবর্ষের মনকে একযুগ থেকে আরেক যুগে নিয়ে যেতে পেরেছেন। কেবল একদল রাষ্ট্রনৈতিকের নয়, সমস্ত জনসাধারনের মনকে তিনি বিচলিত করতে পেরেছেন। আজ পর্যন্ত আর কেউ তা করে উঠতে পারেনি। মহাত্মাজীর চরিত্রের এই প্রবল নৈতিক শক্তিকে, ভক্তি যদি না করতে পারি, তাহলে সেটিকেই বলব অন্ধতা।”
তাই, গান্ধিকে বুলেটে বিদ্ধ করে তাঁর নৈতিকতার গভীর, দীর্ঘ ও দীপ্যমান দর্শনকে নিঃশেষ করা যায় না, তার উজ্জ্বলতা ও উত্তাপ অমলিন এবং অনশ্বর। গান্ধিজির উক্তির মধ্যেই নিহিত তাঁর মননের মৃত্যুহীন অমরত্বের নিঃশব্দ ঘোষণা ঃ
“You can chain me
You can trouble me.
You can ever destroy this body
But you will never imprison my mind.”
–Mahatma Gandhi.
সেই আদর্শের মশাল আজও জ্বলছে দিল্লির রাজঘাটে গান্ধিজির চিতাগ্নির অমর আলোর অনির্বাণ দীপ্তিকে বুকে ধারণ করে।
(সুদিন চট্টোপাধ্যায়ের অনুমতি নিয়ে প্রকাশিত)





