জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জেরে যখন সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ছে, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ বিল নিয়ে এক নতুন দুশ্চিন্তার খবর সামনে এল। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বা সিইএ (CEA) সম্প্রতি বিদ্যুতের মাশুল কাঠামোয় এক আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব যদি কার্যকর হয়, তবে আগামী দিনে তোমার বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ কম হলেও মাসের শেষে বিলের অংকটা বেশ বড় হতে পারে। মূলত বিদ্যুতের ‘ফিক্সড চার্জ’ বা স্থায়ী মাসিক মাশুল এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষেই সওয়াল করেছে এই সংস্থা।
আরও পড়ুনঃ গতকালের পর আজ সাতসকালে ফের ট্রেনে বিধ্বংসী আগুন
বর্তমান ব্যবস্থায় আমরা সাধারণত যতটুকু বিদ্যুৎ খরচ করি, তার ওপর ভিত্তি করেই বিলের বড় অংশটি নির্ধারিত হয়। কিন্তু সিইএ-র রিপোর্টে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা বা ডিসকমগুলোর মোট খরচের প্রায় ৩৮ থেকে ৫৬ শতাংশ ব্যয় হয় পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের বেতন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে আগাম টাকা দেওয়ার পেছনে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, বর্তমান মাশুল কাঠামোয় গ্রাহকদের থেকে ফিক্সড চার্জ হিসেবে এই খরচের মাত্র ৯ থেকে ২০ শতাংশ আদায় করা সম্ভব হয়। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতেই এবার সাধারণ মানুষের ওপর স্থায়ী চার্জের বোঝা চাপানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সৌরশক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। বর্তমান সময়ে অনেক সচ্ছল পরিবার বা বড় শিল্পসংস্থা নিজেদের বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসাচ্ছে। এর ফলে তারা গ্রিডের বিদ্যুৎ কম কিনছে, কিন্তু জরুরি অবস্থা বা রাতের বেলায় ব্যাকআপ হিসেবে ঠিকই সরকারি গ্রিডের ওপর নির্ভর করে থাকছে। সিইএ মনে করছে, এই গ্রাহকরা গ্রিডের পরিকাঠামো ব্যবহার করলেও সেই অনুপাতে টাকা দিচ্ছে না। তাই যারা সোলার প্যানেল বা নেট-মিটারিং ব্যবহার করছ, তাদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা এবং কিছুটা চড়া মাশুল কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—তুমি বিদ্যুৎ ব্যবহার করো বা না করো, গ্রিডের সাথে যুক্ত থাকার জন্য তোমাকে একটি নির্দিষ্ট মোটা অংকের টাকা প্রতি মাসে গুনতে হবে।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে মাজারে তাণ্ডব জামাতের, বলা হল; ‘শুভেন্দুর নির্দেশেই হামলা’
সিইএ-র এই লক্ষ্যমাত্রা বেশ সুদূরপ্রসারী। ২০৩০ সালের মধ্যে একটি ধাপে ধাপে পরিকল্পনা বা ‘ক্যালিব্রেটেড অ্যাপ্রোচ’ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাধারণ গৃহস্থালি এবং কৃষি কাজের ক্ষেত্রে ফিক্সড চার্জের মাধ্যমে খরচের অন্তত ২৫ শতাংশ তুলে আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, শিল্প বা বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এই হার ১০০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তোমার মাসিক বিদ্যুৎ বিলের একটি বড় অংশ আর তোমার ব্যবহারের ওপর নির্ভর করবে না, বরং সেটি হবে একটি বাধ্যতামূলক স্থায়ী খরচ।
পেট্রোল, ডিজেল এবং সিএনজি-র দাম বাড়ার ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিলের এই সম্ভাব্য পরিবর্তন মধ্যবিত্তের জন্য বড়সড় একটি ধাক্কা হতে পারে। যদিও এই প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত নয় এবং এটি ‘ফোরাম অফ রেগুলেটর’-এর কাছে বিবেচনার জন্য পাঠানো হবে, তবুও এই খসড়া স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে আগামী দিনে সস্তায় বিদ্যুৎ পাওয়ার দিন বোধহয় শেষ হতে চলেছে। সব মিলিয়ে, কেবল মাস গেলেই নয়, বরং তোমার জীবনযাত্রার খরচের হিসাব মেলাতে বিদ্যুৎ এখন এক বড় দুশ্চিন্তার নাম হয়ে উঠতে পারে।



