মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান সংলগ্ন সামশেরগঞ্জের এক প্রত্যন্ত গ্রাম খোদাৰন্দপুর। এই জনপদ থেকেই উঠে এল এমন এক বিস্ময়কর কাহিনী, যা হার মানায় রূপোলি পর্দার চিত্রনাট্যকেও। ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর গোটা রাজ্য যখন কৃতিদের তালিকা নিয়ে ব্যস্ত, তখন খবরের শিরোনামে উঠে এল দুই যমজ ভাই— আবিদ হাসান ও আকিল হাসান। তাঁদের প্রাপ্ত নম্বর কেবল সাধারণ মেধার প্রতিফলন নয়, বরং এক অদম্য লড়াই এবং গাণিতিক সমাপতনের অনন্য নিদর্শন।
কাঞ্চনতলা জে.ডি.জে ইনস্টিটিউশনের এই দুই ছাত্রের পরীক্ষার ফলে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব কাণ্ড। দুজনেই ৫০০ নম্বরের মধ্যে ঠিক ৩৯৪ পেয়েছেন। শতকরা হিসেবে যা ৭৮.৮ শতাংশ। যমজ ভাইদের আচার-আচরণ বা চেহারায় মিল থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের মতো বড় মাপের একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দুজনেরই একেবারে এক নম্বর পাওয়া সত্যিই বিরল। তবে এই ফলের পেছনে লুকিয়ে থাকা কঠোর পরিশ্রমের খতিয়ানটি আরও বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক।
আরও পড়ুনঃ ১০ দিনের জল্পনার অবসান! ভিডি সতীশন কেরলের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে
আবিদ ও আকিলের বাবা জাহাঙ্গীর আলম পেশায় এক গোয়ালার কাজ করতেন। কিন্তু গত প্রায় দুই বছর ধরে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। পরিবারের উপার্জনের একমাত্র পথটি যখন প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল, তখন হাল ধরেছিলেন তাঁদের বড় ভাইয়েরা। তবে আবিদ ও আকিলও পিছিয়ে থাকেননি। সকালে বইপত্র নিয়ে পড়াশোনার টেবিলে বসার আগে বা রাতে পড়াশোনা শেষে তাঁদের অনেকটা সময় দিতে হতো বাড়ির গবাদি পশুর দেখাশোনার কাজে। একদিকে যেমন গোয়াল পরিষ্কার থেকে শুরু করে ঘাস কাটার কাজে দাদাদের সাহায্য করতে হতো, ঠিক তেমনই আবার পড়ার ঘরে ফিরে বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণে মন বসাতে হতো। খাটালের কাজের সেই ঘাম আর বইয়ের পাতার কালির মেলবন্ধনেই আজ তাঁরা এই সাফল্যে পৌঁছেছেন।
এই ৩৯৪ নম্বরের ব্যবচ্ছেদ করলে এক অদ্ভুত বিষয় নজরে আসে। দুই ভাইয়ের মোট নম্বর এক হলেও বিষয়ে ভিত্তিক প্রাপ্ত নম্বরে রয়েছে সামান্য তারতম্য। আবিদ হাসান বাংলাতে পেয়েছেন ৭৭, ইংরেজিতে ৮৭, কেমিস্ট্রিতে ৭৬, অংকে ৮০, ফিজিক্সে ৭২ এবং বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে ৭৪। অন্যদিকে, আকিল হাসান বাংলাতে ৮০, ইংরেজিতে ৮৬, কেমিস্ট্রিতে ৭২, অংকে ৭৮, ফিজিক্সে ৬৫ এবং বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে ৭৮ নম্বর অর্জন করেছেন। দেখা যাচ্ছে, ইংরেজির মতো বিষয়ে তাদের নম্বরের ব্যবধান মাত্র ১। আবার অংক বা বায়োলজিতেও একে অপরের খুব কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে তাঁদের মেধার স্তর কতটা সমান্তরাল।
আরও পড়ুনঃ ‘এখানে নাটক করবেন না’, শুনতে হল মমতাকে
এই লড়াইয়ে মায়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মা রেনু বিবি স্বপ্ন দেখতেন ছেলেদের শিক্ষিত করার। অভাবের সংসার, স্বামীর অসুস্থতা— সব মিলিয়ে পাহাড়প্রমাণ চাপের মধ্যেও তিনি সন্তানদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে দেননি। আবিদ ও আকিলের এই জয় আসলে সেই সংগ্রামী মায়েরও জয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মাসুদ হাই রহমান এই সাফল্যে আবেগাপ্লুত। তিনি জানিয়েছেন যে, দুই ভাই স্কুলে অত্যন্ত ভদ্র ও মনোযোগী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তাঁদের পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানত, তাই আজ এই সমাপতন দেখে তাঁরা যারপরনাই আনন্দিত।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও দুই ভাই নিজেদের লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছেন। দুজনেই বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁরা কিছুটা আলাদা পথে হাঁটতে চান। আকিল হাসানের ইচ্ছা ভবিষ্যতে মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করার, কারণ অণুজীবের জগত তাঁকে টানে। অন্যদিকে আবিদ হাসান জীববিজ্ঞান বা পিওর বায়োলজি নিয়ে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে চান।
এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সামশেরগঞ্জ ব্লকের এই সাধারণ বাড়িটিতে এখন উৎসবের আমেজ। প্রতিবেশীরা দলে দলে আসছেন তাঁদের দেখতে। আবিদ ও আকিলের এই কাহিনী বুঝিয়ে দেয় যে, জীবন যুদ্ধে জেতার জন্য রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা নয়, বরং অটল জেদ আর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সঙ্কল্পই যথেষ্ট। দারিদ্র্য যে প্রতিভার পথে বাধা হতে পারে না, মুর্শিদাবাদের এই দুই যমজ ভাই আজ তা সগর্বে প্রমাণ করে দিলেন। তাদের এই একই নম্বর পাওয়ার বিষয়টি কেবল একটি সংখ্যাতত্ত্ব নয়, বরং একই সমান্তরালে এগিয়ে চলা দুই লড়াকু যোদ্ধার সাফল্যের স্বাক্ষর।


