ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ভাসছে গোটা বাংলাদেশ। পাড়ায় পাড়ায়, বাড়ির ছাদে সগর্বে উড়ছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। কিন্তু এই উৎসবের মেজাজের আড়ালেই নিঃশব্দে মাথাচাড়া দিচ্ছে এক গভীর উদ্বেগ। ফুটবল-জ্বরের মাঝেই রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আচমকা ছেয়ে গিয়েছে কালেমা খচিত কালো-সাদা পতাকা। এই নিশানগুলির সঙ্গে আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট (IS) বা তালিবানের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলির পতাকার হুবহু মিল থাকায়, বাংলাদেশ তো বটেই, প্রতিবেশী ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে সাউথ ব্লকের।
আরও পড়ুনঃ ঘ্যাচাং! পরকীয়ার ‘নেশা’, পুরুষাঙ্গ কাটলেন স্ত্রী
গত ১৭ জুন ঢাকার একটি ফ্লাইওভারে প্রথম আরবি হরফ লেখা এই রহস্যময় পতাকার দেখা মেলে। এরপরেই ঢাকা ট্রিবিউনের রিপোর্ট অনুযায়ী, মিরপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং ফরিদপুরেও একই ছবি ধরা পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, এই পতাকা হাতে রীতিমতো বাইক-মিছিল ও সমাবেশ করছে একদল যুবক। আর এতেই রাতের ঘুম উড়েছে ওপার বাংলার পুলিশ ও গোয়েন্দাদের।
মূলত দু’ধরনের পতাকা দেখা যাচ্ছে, দুটিতেই আরবিতে লেখা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। একটি সাদা পটভূমিতে কালো হরফে (তালিবানের পতাকার মতো), অন্যটি কালো পটভূমিতে সাদা হরফে (আল-কায়েদা বা আইএসের ব্যবহৃত নিশান)।
গোয়েন্দাদের সন্দেহ, এর নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে নিষিদ্ধ কট্টরপন্থী সংগঠন ‘হিজবুত তাহরীর’। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার এদের নিষিদ্ধ করলেও, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর তারা ফের প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, গত বছর মাজার ও সুফি জমায়েতে হামলায় অভিযুক্ত ‘তৌহিদি জনতা’ নামক আরও একটি গোষ্ঠীও বেশ কয়েকটি জায়গায় এই মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে খবর মিলেছে।
আয়োজকদের একাংশের দাবি, বিশ্বকাপ ফুটবলের ‘অন্ধ উন্মাদনা’ থেকে যুবসমাজকে দূরে রাখতে এবং বিশ্বে মুসলিমদের ওপর নিপীড়নের প্রতিবাদ জানাতেই এই প্রচার। কট্টরপন্থী সংগঠন ‘হেফাজতে ইসলাম’-এর নেতা মুফতি হারুন ইজহারের একটি বিতর্কিত ভিডিও সম্প্রতি সামনে এসেছে। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “এই পতাকাকে যদি জঙ্গিবাদের প্রতীক বলা হয়, তবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকাও অবিলম্বে নামিয়ে ফেলতে হবে!”
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করার কথা জানিয়েছিলেন আগেই; এ বার জানালেন সময়সীমাও
প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত থাকায় বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি ভারতের (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের) জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বহু কট্টরপন্থী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নিজেদের জাল বিস্তার করতে শুরু করেছে।
সম্প্রতি ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের অন্যতম কাণ্ডারি তথা কট্টর ভারত-বিরোধী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের সাংসদ হাসনাত আব্দুল্লাহকেও আল-কায়েদার পতাকার সামনে দেখা গিয়েছে। এর আগে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে (সেভেন সিস্টার্স) বিচ্ছিন্ন করারও হুমকি দিয়েছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. তৌহিদ হক সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই প্রচার আসলে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলির নিজেদের অস্তিত্ব ও প্রভাব জানান দেওয়ার একটি ‘ড্রেস রিহার্সাল’। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এই চরমপন্থী আস্ফালন কীভাবে রুখে দেয় এবং তা ভারতের আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তায় কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন কড়া নজর রাখছে নয়াদিল্লি।


