কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন। সেখানে উপস্থিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল, দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত রয়েছেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল। সেখান থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের একবার কেন্দ্রকে দুষলেন।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “আজকাল একটা ট্রেন্ড চলছে – এজেন্সি দিয়ে অপমান করা।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কিছু সংস্থা ইচ্ছাকৃতভাবে বদনাম করার চেষ্টা করছে এবং তার জেরে মানুষের সম্মানহানি হচ্ছে। এই বিষয়টির দিকে বিচারব্যবস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিদের উদ্দেশে মমতার বার্তা ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, “আমরা আপনাদের কাস্টডিতে রয়েছি। সংবিধানকে বাঁচানোর দায়িত্ব আপনাদের।” মুখ্যমন্ত্রীর মতে, দেশ, মানুষ ও গণতন্ত্রকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মমতা জানান, এই কথা তিনি শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, দেশের সমস্ত মানুষের সম্মানের প্রশ্নে বলছেন। তাঁর দাবি, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিশানা করে যদি এজেন্সির অপব্যবহার হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ভিতকেই দুর্বল করে দেয়।
হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের নতুন ভবনের উদ্বোধনের মতো এই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়। বিচারপতিদের সামনে দাঁড়িয়ে এজেন্সি নিয়ে এই সরব অবস্থান যে শুধুই রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি সাংবিধানিক বার্তা – সে ইঙ্গিতও দেন তিনি।
তবে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পরই পাল্টা আক্রমণে নামে বিজেপি ও সিপিএম। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার কটাক্ষ করে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে তিনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁর দাবি, এসআইআর সম্পূর্ণ হলে তৃণমূলের পরাজয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। আরও তীব্র আক্রমণে তিনি বলেন, যে বিচারব্যবস্থার কাছে মুখ্যমন্ত্রী সাহায্য চাইছেন, সেই বিচারব্যবস্থার কাজই হবে আগে তাঁকে জেলে পাঠানো।
অন্যদিকে, সিপিএম নেতা ও আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের অভিযোগ, এ রাজ্যের বিচারপতিদের সামনে কটূ কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বিচারব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করেছেন। তাঁর কটাক্ষ, সার্কিট বেঞ্চের নতুন ভবনের উদ্বোধনে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের কথা না বলে মমতা কার্যত নিজের দলের গুন্ডামির পক্ষে বিচারপতিদের দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ শহরে ছেলেরাও সেফ নয়! মার্কেটে নতুন উৎপত্তি কাকার
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন আইপ্যাক-ইডি মামলায় রাজ্য সরকার বড় ধাক্কা খেয়েছে। কয়লা পাচার মামলায় ইডি কলকাতার আইপ্যাক অফিস ও সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালায়। সেই খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার, কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ কুমার ভার্মা সহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা। এই ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে মামলা গড়ায়।
গত ১৫ তারিখ সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকারের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী নির্দেশে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দেয়, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজে রাজ্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অভিযোগ কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
বিচারপতি জে মিশ্র বলেন, এই মামলা চাইলে খুব কম সময়েই নিষ্পত্তি করা যেত। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি গুরুতর, তাই সমস্ত বক্তব্য নথিভুক্ত করে চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, মামলার সব পক্ষকে নোটিস দিতে হবে, রাজ্য সরকারকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কাউন্টার হলফনামা জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, ৮ জানুয়ারির তল্লাশির সিসিটিভি ফুটেজ ও স্টোরেজ ডিভাইস সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ইডি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে চলমান সব পুলিশি তদন্ত স্থগিত থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে জলপাইগুড়ির মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য রাজ্য-রাজনীতিতে নতুন করে এজেন্সি, বিচারব্যবস্থা ও সাংবিধানিক সীমারেখা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র করল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।









