কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
বলির সময় নাকি থরথর করে কেঁপে উঠত মা কালীর মূর্তি! পশুবলির দৃশ্য দেখার জন্য দেবী নিজেই নাকি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তেন! মূর্তির ভারসাম্য রক্ষা এবং সেই ভয়ংকর দৃশ্য আটকাতে একসময় স্বয়ং দেবীকেও বেঁধে রাখা হতো লোহার শিকলে! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বাংলার লোকইতিহাসে এমন এক রোমহর্ষক ও রহস্যময় ঘটনার সাক্ষী মালদহ জেলার হবিবপুরের মানিকোড়া গ্রামের বিখ্যাত ‘ডাকাতকালী’ পুজো।
আরও পড়ুনঃ সাহিত্য ও ইতিহাসের অপূর্ব মেলবন্ধন; পূর্ব মেদিনীপুরের ঐতিহ্যবাহী দরিয়াপুরের কপালকুণ্ডলা মন্দির
১. ঘন জঙ্গল, পুনর্ভবা নদী ও ডাকাতদের আস্তানা
আজ যেখানে কালীপুজোয় হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে, প্রায় তিনশো বছর আগে সেই মানিকোড়া অঞ্চলটি ছিল এক অত্যন্ত দুর্গম ও ঘন জঙ্গলঘেরা জনপদ।
-
ডাকাত দলের তাণ্ডব: এই এলাকার পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে পুনর্ভবা নদী। জনশ্রুতি রয়েছে, একসময়ে রাতের অন্ধকারে নদী পথ পেরিয়ে এখানে আসত দুর্ধর্ষ ডাকাতদল। হাতে জ্বলন্ত মশাল, কোমরে ধারালো অস্ত্র আর মুখে দেবীর জয়ধ্বনি তুলে তারা জঙ্গলের গভীরে গড়ে ওঠা আস্তানায় পুজো দিত।
-
গোপন আরাধনা: সূর্য ওঠার আগেই পুজো সেরে রাতের অন্ধকারে ফের তলিয়ে যেত সেই ডাকাতেরা। অপরাধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা সেই অন্ধকার জগতেই শুরু হয়েছিল এই ডাকাতকালীর আরাধনা।
২. মূর্তির কেঁপে ওঠা ও শিকলে বাঁধার অদ্ভুত প্রথা
এই ডাকাতকালীকে ঘিরেই রয়েছে এক গা-ছমছমে ও লোমহর্ষক লোককথা:
-
সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া: প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কালীপুজোর গভীর রাতে যখন পশুবলি দেওয়া হতো, তখন নাকি হঠাৎ কেঁপে উঠত দেবীর মূর্তি। শুধু তাই নয়, বলির সেই রক্তক্ষয়ী দৃশ্য দেখার জন্য জীবন্ত মানুষের মতো মা কালী নাকি নিজে থেকেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তেন!
-
লোহার শিকলে বন্দি দেবী: মূর্তি পড়ে যাওয়ার বা অলৌকিক কোনো অঘটনের আশঙ্কায় ডাকাতেরা এক অদ্ভুত ব্যবস্থা নেয়। মোটা লোহার শিকল দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয় মা কালীর মূর্তিটিকে। যে দেবীর অভয়চরণে ডাকাতেরা নিজেদের জীবন সঁপে দিত, সেই আরাধ্যাকেই আবার শিকলে বন্দি করে রাখতে হতো।
৩. প্রথার বদল ও বর্তমান রূপ
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডাকাত রাজত্বের অবসান ঘটেছে, বদলেছে পুজোর আচারও।
-
চোখ ও মুখ আড়াল করার রীতি: বর্তমানে আর দেবীকে শিকলে বেঁধে রাখা হয় না। তবে আজও চোখদান এবং পশুবলির সময় দেবীর মুখ কিংবা মন্দিরের প্রবেশপথ বিশেষ কাপড় দিয়ে আড়াল করার প্রাচীন রীতি কঠোরভাবে মেনে চলা হয়।
-
জমিদার আমল থেকে গ্রামের পুজো: লোককথা বলে, ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় জমিদার ভৈরবেন্দ্র নারায়ণ রায় জঙ্গলের মধ্যে ডাকাতদের সেই পরিত্যক্ত পুজোর বেদি আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে জমিদার পরিবারের উদ্যোগেই নতুন করে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। কালক্রমে জমিদারি প্রথা উঠে গেলে পুজোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেন স্থানীয় গ্রামবাসীরাই।
আরও পড়ুনঃ শ্মশানের পোড়া কাঠ, নরমুণ্ড ও পঞ্চমুন্ডির আসনের রহস্যাবৃত গর্ভগৃহের ভয় ও ভক্তির অনন্য আধ্যাত্মিক দুনিয়া! উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়ার তারাশঙ্করী পীঠ
৪. বর্তমান ঐতিহ্য ও আজও টিকে থাকা মশাল প্রথা
-
বিশাল প্রতিমা: আজও এখানে প্রায় সাড়ে সাত হাত উচ্চতার বিশালাকার কালীপ্রতিমা নির্মাণের প্রাচীন ঐতিহ্য বজায় রয়েছে।
-
মশালের ব্যবহার: ডাকাতদের স্মৃতি বিজড়িত সেই অন্ধকার যুগের কথা মাথায় রেখে আজও পুজোর দিনগুলিতে মশাল জ্বালিয়ে আরাধনা করার রেওয়াজ রয়েছে।
-
এলাকার মানুষের অগাধ বিশ্বাস যে, মানিকোড়ার মা কালী অত্যন্ত জাগ্রত। গ্রামের যেকোনো শুভ কাজের আগে দেবীর পুজো দেওয়ার রীতি আজও প্রচলিত। শনি, মঙ্গলবার ছাড়াও বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে মায়ের পুজো হয়।
ঐতিহাসিক তথ্য বা প্রমাণের আলোয় এই অলৌকিক ঘটনাগুলি হয়তো প্রমাণিত নয়, এগুলি সম্পূর্ণই স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরা লোকবিশ্বাস। তবুও তিনশো বছর আগের সেই ভয়ংকর জঙ্গল, ডাকাতদের হাতে থাকা লোহার অস্ত্র আর তাঁদের আরাধ্যা দেবীর শরীরে জড়ানো লোহার শিকলের গল্প আজও শিহরণ জাগায়। ডাকাতদের সেই স্মৃতিকে ছাড়িয়ে মানিকোড়ার মা কালী আজ হয়ে উঠেছে সমগ্র অঞ্চলের অকৃত্রিম ভক্তি ও বিশ্বাসের আলো।


