কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
চা বাগান ও জঙ্গলঘেরা ডুয়ার্সের মাটিতে মানুষ ও বন্যপ্রাণের দ্বন্দ্বের ইতিহাস দীর্ঘ। তবে জলপাইগুড়ির ধূপগুড়িতে যা ঘটল, তা সাহসিকতা এবং আত্মরক্ষার এক অবিশ্বাস্য নজির হয়ে রইল। জঙ্গল লাগোয়া নিজের কৃষিজমিতে ধান কাটতে গিয়ে হঠাৎই একটি পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘের মুখোমুখি পড়েন ৬০ বছরের এক বৃদ্ধা বাসন্তী রায়। পালানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ না পেয়ে হাতে থাকা ধান কাটার কাঁচি সম্বল করেই সাক্ষাৎ মৃত্যুর সঙ্গে লড়লেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অসম লড়াইয়ে হিংস্র শ্বাপদকে পিছু হটতে বাধ্য করে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন ওই সাহসী কৃষিজীবী নারী।
আরও পড়ুনঃ ‘জীবনটা ‘মক পার্লামেন্ট’-এ কাটাতে হবে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ নেই’! রাহুলকে নিশানা শাহের
১. ধানখেতে সাক্ষাৎ যম: মুহূর্তের মধ্যে চিতাবাঘের আক্রমণ
ঘটনাটি ঘটেছে জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ি ব্লকের মরাঘাট রেঞ্জের ঝাড়আলতা-২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের গারঘুটা এলাকায়, যার ঠিক পাশেই রয়েছে খুট্টিমারি জঙ্গল।
-
ধান কাটতে যাওয়া: রবিবার বাসন্তী দেবী প্রতিদিনের মতো একাই নিজেদের জমিতে ধান কাটতে গিয়েছিলেন।
-
হঠাৎ মুখোমুখি: ধান কাটার কাজ চলাকালীন আচমকাই তাঁর ঠিক পেছনে এসে হাজির হয় একটি চিতাবাঘ। বৃদ্ধা মুখ ঘোরাতেই থমকে যান—সামনে তখন সাক্ষাৎ মৃত্যু। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চিতাবাঘটি তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মাটিতে ফেলে দেয়।
২. কাঁচি হাতে অসম লড়াই: পিছু হটল শ্বাপদ
জীবন মৃত্যুর সেই চরম সংকটের মুহূর্তেও মনোবল হারাননি ষাটোর্ধ্ব বাসন্তী দেবী।
-
পাল্টা আক্রমণ: আত্মরক্ষার আর কোনো রাস্তা না পেয়ে হাতে থাকা ধান কাটার কাঁচিটিকেই হাতিয়ার করেন তিনি। চিতাবাঘ যখন তাঁকে কামড়ে ধরার চেষ্টা করছে, তখন সর্বশক্তি দিয়ে সেই কাঁচি দিয়েই জন্তুটির ওপর কোপ ও খোঁচা দিতে শুরু করেন বাসন্তী।
-
জঙ্গলে পলায়ন: বৃদ্ধার এমন অপ্রত্যাশিত ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত কুলিয়ে উঠতে পারেনি চিতাবাঘটি। কাঁচির আঘাতে জখম হয়ে সেটি বৃদ্ধাকে ছেড়ে দ্রুত পাশের জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়।
আরও পড়ুনঃ বদলের বাংলায় বিরাট পরিবর্তন! থাকলেন জ্যোতি বসু, সরলেন মমতা
৩. হাসপাতাল ও বন দপ্তরের প্রতিক্রিয়া
বাসন্তী দেবীর আর্তচিৎকারে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা দ্রুত ছুটে আসেন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ধূপগুড়ি মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান।
-
আঘাতের বিবরণ: চিতাবাঘের নখের আঁচড় ও কামড়ে বাসন্তীর বুক, কোমর এবং পায়ে গভীর ক্ষত হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, পরবর্তী সময়ে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
-
বন দপ্তরের পদক্ষেপ: মরাঘাট রেঞ্জের সোনাখালি বিট অফিসে খবর যাওয়ার পর বন দপ্তরের কর্মীরা হাসপাতালে গিয়ে বৃদ্ধার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
-
স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক: ডুয়ার্সের এই এলাকায় এর আগেও চিতাবাঘের হানার ঘটনা ঘটেছে। কিছুদিন আগেই কলাবাড়ি এলাকায় বাড়ি থেকে একটি শিশুকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমান ধান কাটার মরসুমে জমিতে নামতে গিয়ে শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। জঙ্গল লাগোয়া চাষের জমিগুলিতে বন দপ্তরের নজরদারি বাড়ানো এবং কৃষকদের সুরক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


