ভারতের অর্থনীতি এখন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল শক্তি—এই দাবি আমরা গত কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে ভারতকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছিলেন, তা নিয়ে দেশজুড়ে অনেক আশা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু IMF বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডারের ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সাম্প্রতিক ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ রিপোর্ট আমাদের সামনে এক অন্য ছবি তুলে ধরেছে। তথ্যানুসারে, ভারত তার পঞ্চম স্থান হারিয়ে এখন বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতিতে নেমে এসেছে। যেখানে ভারতের সামনে থাকার কথা ছিল জার্মানি বা জাপানের, সেখানে আমরা এখন ব্রিটেন এবং জাপানের পেছনে পড়ে গিয়েছি। এই খবরটা শোনার পর মনে হতেই পারে যে, ভারতের অর্থনৈতিক ইঞ্জিনে কি তবে মরচে ধরল? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গাণিতিক মারপ্যাঁচ?
প্রথমেই যে বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে তা হলো গ্লোবাল জিডিপি র্যাঙ্কিং কীভাবে করা হয়। আন্তর্জাতিক স্তরে যখন বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির তুলনা করা হয়, তখন সেই হিসাবটি করা হয় মার্কিন ডলারে। এখানেই ভারত সবথেকে বড় ধাক্কা খেয়েছে। গত এক বছরে ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার দাম অস্বাভাবিক হারে কমেছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকেও যেখানে এক ডলারের দাম ছিল ৮৪-৮৫ টাকা, ২০২৬ সালের এই সময়ে তা ৯৩ থেকে ৯৫ টাকার ঘর স্পর্শ করেছে।
আরও পড়ুনঃ ২৬-এ বিজেপি পেতে পারে ১৭০-১৭৪ আসন! এটাই বাস্তবতা
এর মানে হলো, আপনি যদি ভারতে আগের চেয়ে বেশি পণ্য উৎপাদনও করেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে টাকার মান কমে যায়, তবে ডলারের হিসাবে তোমার অর্থনীতির মোট আয়তন ছোট দেখাবে। ভারত মূলত এই মুদ্রার অবমূল্যায়ন বা কারেন্সি ডেপ্রিসিয়েশনের শিকার। ব্রিটেন বা জাপানের মুদ্রা ডলারের সাপেক্ষে ভারতের চেয়ে কিছুটা স্থিতিশীল থাকায় তারা খুব সামান্য ব্যবধানে ভারতকে টপকে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ভারতের প্রকৃত বৃদ্ধির হার বা রিয়েল জিডিপি গ্রোথ কি তবে কমে ৪-৫ শতাংশে নেমে এসেছে? আসলে বিষয়টি একটু জটিল। তুমি যদি বর্তমানের বিভিন্ন রিপোর্ট দেখো, তবে দেখবে ভারত এখনো ৬.৪% থেকে ৬.৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্বের অন্যান্য বড় দেশ যেমন আমেরিকা বা চীনের তুলনায় এই বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয়েছে জিডিপি গণনার নতুন পদ্ধতি বা ‘বেস ইয়ার’ পরিবর্তনের ফলে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সরকার জিডিপি গণনার ভিত্তি বছর ২০১১-১২ থেকে বদলে ২০২২-২৩ করেছে। এই নতুন পদ্ধতিতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের তথ্য পুনর্মূল্যায়ন করায় দেখা গেছে যে, ভারতের নমিনাল জিডিপি আগে যা ভাবা হয়েছিল তার থেকে প্রায় ৩-৪% কম। এই গাণিতিক সংশোধনের ফলে কাগজ-কলমে ভারতের অর্থনীতির আকার কিছুটা সংকুচিত হয়েছে, যা র্যাঙ্কিংয়ে প্রভাব ফেলেছে।
এর পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা গ্লোবাল পলিটিক্সকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমাগত যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় থাকায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম চড়চড় করে বেড়েছে। ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে।
তেলের দাম বাড়লে শুধু যে দেশের ভেতর পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ে তাই নয়, আমাদের প্রচুর পরিমাণে ডলার খরচ করতে হয়। এর ফলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি (Trade Deficit) বাড়ে এবং বিদেশের বাজারে টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও আমেরিকা যদি তাদের শুল্ক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনে, তবে ভারতের রপ্তানি বাণিজ্য ধাক্কা খায়। এই সবকটি কারণ মিলেমিশে ভারতের অগ্রগতির গতিকে কিছুটা মন্থর করে দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এর প্রভাব ঠিক কতটা? মুদ্রাস্ফীতি বা জিনিসের দাম বাড়ার ফলে মানুষের কেনার ক্ষমতা কিছুটা কমেছে। খুচরো মুদ্রাস্ফীতি যখন ৪.৭% বা তার আশেপাশে থাকে, তখন মধ্যবিত্ত মানুষের সঞ্চয়ে টান পড়ে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে গেলে দেশের উৎপাদন শিল্পও কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে।
আরও পড়ুনঃ ‘ভোট লুঠের কৌশল’! বাসন্তীতে গোপন ‘খেলা’ চলছে? নির্দলে তৃণমূল নেতা!
যদিও সরকারি পরিকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচারে প্রচুর বিনিয়োগ হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত খরচ বা প্রাইভেট কনজাম্পশন না বাড়লে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন ছোঁয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তবে এখনই হতাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। IMF-এর রিপোর্টেই বলা হয়েছে যে, ভারতের এই পতন সম্ভবত সাময়িক। ভারত এখনো বিশ্বের ‘ব্রাইট স্পট’।
সব শেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই পরিসংখ্যান মোদী সরকারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের লড়াইয়ে না মেতে টাকার মান স্থিতিশীল করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। জাপানের অর্থনীতি বর্তমানে স্থবির এবং ব্রিটেনও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই।
সেই তুলনায় ভারতের বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেক বেশি। যদি অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং রপ্তানি বাণিজ্যে ভারত আরও জোর দিতে পারে, তবে ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মধ্যেই আমরা হয়তো আবার ব্রিটেন ও জাপানকে পেছনে ফেলে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির মুকুট অর্জন করতে পারব।
পরিসংখ্যানের এই ওঠানামা থাকবেই, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হচ্ছে, সেটাই হওয়া উচিত সাফল্যের আসল মাপকাঠি। তুমি যখন চারপাশের উন্নয়নের দিকে তাকাচ্ছ, তখন মনে রেখো যে বড় লক্ষ্যের পথে ছোটখাটো ধাক্কা আসাই স্বাভাবিক, আসল চ্যালেঞ্জ হলো সেই ধাক্কা সামলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো।



