কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন তথ্য প্রযুক্তি বিধি ঘিরে ফের বিতর্ক তৈরি হয়েছে দেশে। কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক বা মেইটিওয়াই জানিয়ে দিয়েছে, ২০২১ সালের তথ্য প্রযুক্তি বিধির দ্বিতীয় সংশোধনী খুব শীঘ্রই চূড়ান্তভাবে জারি করা হতে পারে। এই খসড়া সংশোধনী নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় সংবাদ বা চলতি ঘটনা সংক্রান্ত পোস্ট করা সাধারণ ব্যবহারকারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
গত ৩০ মার্চ মেইটিওয়াই নতুন খসড়া সংশোধনী প্রকাশ করে। এরপর জনমত ও আপত্তি জানানোর জন্য সময় দেওয়া হয়। সূত্র অনুযায়ী, হাজার হাজার মানুষ, ডিজিটাল অধিকার সংগঠন, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা নিজেদের মতামত জমা দেন। পরামর্শ গ্রহণের সময়সীমাও একাধিকবার বাড়ানো হয়। কেন্দ্রের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মে মাসের শেষের দিকেই এই নিয়ম চূড়ান্তভাবে জারি হতে পারে এবং বিতর্কিত ধারাগুলিও সম্ভবত বজায় থাকবে।
আরও পড়ুনঃ গরম আজ সামান্য বাড়তে পারে কলকাতায়; উঠবে ঝড়, বৃষ্টিও হবে ভিজবে দক্ষিণবঙ্গের ৬ জেলা
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে “নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স” বা সংবাদ ও চলতি ঘটনা সংক্রান্ত কনটেন্টকে ঘিরে। সমালোচকদের দাবি, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে শুধু বড় ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম নয়, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল, এক্স হ্যান্ডেল, টেলিগ্রাম চ্যানেল বা স্বাধীনভাবে সংবাদভিত্তিক পোস্ট করা সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলিও সরকারের নজরদারির আওতায় চলে আসতে পারে। অর্থাৎ কোনও ব্যক্তি যদি নিয়মিত রাজনৈতিক খবর, সরকারি সিদ্ধান্ত, প্রতিবাদ, নির্বাচন বা সামাজিক ইস্যু নিয়ে পোস্ট করেন, তাহলে তাকেও “নিউজ শেয়ারকারী” হিসেবে ধরা হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে সরকার সরাসরি প্রত্যেক সোশ্যাল মিডিয়া পেজকে লাইসেন্স দেবে বা নিষিদ্ধ করবে— এমন কথা এখনও খসড়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। কিন্তু উদ্বেগের জায়গা অন্যত্র। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির উপর চাপ বাড়তে পারে যাতে তারা সরকারের নির্দেশ বা পরামর্শ দ্রুত মানে। বিশেষ করে “সেফ হারবার” সুরক্ষা বজায় রাখতে প্ল্যাটফর্মগুলিকে কনটেন্ট সরানো, পোস্ট ব্লক করা, অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করা বা কোনও পেজের রিচ কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
এই কারণেই ডিজিটাল স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বহু সংগঠন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, “সংবাদ” বা “চলতি ঘটনা”র সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত। ফলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট, এমনকি সাধারণ মতামত প্রকাশও নজরদারির আওতায় চলে আসতে পারে। অনেকের মতে, এতে সাধারণ কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়বে। কারণ বড় সংবাদমাধ্যমের মতো আইনি লড়াই চালানোর ক্ষমতা অধিকাংশ ছোট পেজ বা স্বাধীন নির্মাতাদের নেই।
এই বিতর্কের সঙ্গে ফের সামনে এসেছে “ফ্যাক্ট চেক ইউনিট” বা এফসিইউ ইস্যুও। আগের সংশোধনীতে সরকার-নির্ধারিত ফ্যাক্ট চেক ইউনিটকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে “ভুয়ো” তথ্য চিহ্নিত করার ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, সরকার নিজেই যদি ঠিক করে কোন তথ্য সত্য আর কোনটা মিথ্যা, তাহলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর বড় আঘাত হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ দামি জ্বালানি; ১০ দিনে তিনবার বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলে দাম
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এই নিয়মের উদ্দেশ্য সেন্সরশিপ নয়, বরং ভুয়ো খবর, বিভ্রান্তিকর প্রচার, ভুয়ো পরিচয় এবং ক্ষতিকর ভাইরাল কনটেন্ট রোধ করা। সরকারের বক্তব্য, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিকে আরও দায়বদ্ধ ও নিরাপদ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সংশোধনী কার্যকর করতে সংসদে আলাদা করে ভোটাভুটি প্রয়োজন নেই। কারণ তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০০০-এর অধীনে কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি নিয়ম সংশোধনের ক্ষমতা রাখে। চূড়ান্ত গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশ হলেই এই নিয়ম কার্যকর হতে পারে। যদিও পরে আদালতে এই নিয়ম চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
ফলে এখন নজর রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ এই সংশোধনী শুধু বড় প্রযুক্তি সংস্থা নয়, ভারতের কোটি কোটি সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর অনলাইন ভবিষ্যতের উপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।



