শ্রাবণ পূর্ণিমার প্রাক্কালে বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতিতে ‘রাখিবন্ধন’ কেবল একটি ধর্মীয় বা পারিবারিক অনুষ্ঠান নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস, বদলে যাওয়া সম্পর্কের রসায়ন এবং নস্টালজিয়ার মেলবন্ধন।
আরও পড়ুনঃ অতিবৃষ্টি ও হড়পা বানের সতর্কতা; পর্যটকদের জন্য প্রশাসনের জরুরি নির্দেশিকা
প্রেম-প্রত্যাখ্যানের মোক্ষমাস্ত্র: নব্বইয়ের নস্টালজিয়া
নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে কলকাতার নামজাদা কো-এড কলেজগুলোতে (যেমন স্কটিশ চার্চ বা সেন্ট জেভিয়ার্স) রাখির দিনটি ছিল তামাম ‘প্রেমিক-কুল’-এর জন্য এক মহা আতঙ্কের দিন।
-
‘ভাই-জোন’ বা ‘সিবিএসটি’ (CBS T) অস্ত্র: কোনো তরুণীকে প্রোপোজ করার পর তিনি যদি সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে ‘ভাই’ বা ‘কেবল বন্ধু’ বানাতে চাইতেন, তবে পাঁচ টাকার একটি রেশমি বা কারুকাজ করা রাখিই ছিল তাঁর মোক্ষমাস্ত্র।
-
শুভব্রতের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা: প্রবীণ শুভব্রত চক্রবর্তীর কথায়, এই পাঁচ টাকার রাখি অনেক সময় জটিল ও অসফল প্রেম থেকে উভয় পক্ষকেই ‘রক্ষা’ করেছে। এটি প্রচলিত ‘রক্ষাবন্ধন’ ধারণার এক অনন্য ও বাস্তবমুখী রূপ।
-
কোচিং ক্লাস থেকে গলিঘুঁজি: বিশ্বায়ন-পূর্ব বাংলায় “তোর সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে পারি, কিন্তু সম্পর্কে জড়ানো সম্ভব নয়”—এই ধূসর বাক্যটি রাখির সুতোয় বেঁধে রূপ নিত চরম ট্র্যাজেডি বা প্রেমে ভরা বিচ্ছেদে।
সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব: রাখি বনাম ভাইফোঁটা
বাঙালির মূল ধারার পারিবারিক ঐতিহ্যে রাখি বনাম ভাইফোঁটার এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন বরাবরই ছিল।
-
হিন্দি বলয়ের প্রভাব: পঞ্চাশোর্ধ্ব শিক্ষিকা শুদ্ধা দেবনাথ বা তাঁর সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দেওয়া কন্যা যাজ্ঞসেনীর মতে, ভাই-বোনের ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তাঁদের প্রথম পছন্দ ‘ভাইফোঁটা’। তাঁদের দৃষ্টিতে রাখি মূলত হিন্দি বলয়ের সংস্কৃতি ও বলিউডি সিনেমার মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া এক প্রথা।
-
বাজারের বাস্তব চিত্র: শ্যামবাজারের মরসুমি বিক্রেতা মানস দাসের মতে, ভাইফোঁটার জনপ্রিয়তা থাকলেও আজও রাখির বিপুল ক্রেতা মূলত তরুণ-তরুণী ও কলেজ স্টুডেন্টরাই।
আরও পড়ুনঃ সততা ও নিঃস্বতার মর্মান্তিক কোলাজ; বাসন্তীতে শয্যাশায়ী প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য নিতাই সরদার ও স্ত্রী চপলার চরম দুর্দিন! চোখের জলে প্রাক্তন মন্ত্রী সুভাষ নস্করের…
পণ্য ও প্রথার বিবর্তন
-
ডিজাইন ও ট্রেন্ড: আশির দশকের মোটা স্পঞ্জ বা দশ টাকার নোটের রাখির জায়গা নিয়েছে এখন স্লিম, স্লিক, ডিজাইনার ডোর এবং অনলাইন কম্বো প্যাক (ড্রাই ফ্রুটস, চকোলেট সহ)। এমনকি হাতঘড়ি কোম্পানিগুলোও এখন ঘড়িকে রাখি হিসেবে বিপণন করছে।
-
আপিসপাড়ার ‘রক্ষক’ রাখি: পুরনো কলকাতার সওদাগরি অফিসে (যেমন বিবাদী বাগ অঞ্চল) দ্বাররক্ষক বা সিকিউরিটি গার্ডদের রাখি পরিয়ে নগদ উপহার দেওয়ার সাবেক প্রথা আজও চালু আছে, যদিও আধুনিক কর্পোরেট কালচারে তা অনেকটাই বিলুপ্ত।
-
জেন-জি (Gen Z): আজকের প্রজন্মের পড়ুয়া অনিকেত বা ঋদ্ধিমারা প্রেমের প্রস্তাব কিংবা প্রত্যাখ্যানের জন্য আর রাখির ওপর নির্ভর করেন না। ডিজিটাল যুগে সম্পর্কের ভাষা ও মাধ্যম দুই-ই বদলে গেছে।
১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ ও রবীন্দ্রনাথের বিকল্প ‘রাখি’
প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর (৩০ আশ্বিন)—লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহাসিক রাখিবন্ধন উৎসব।
গঙ্গাস্নান সেরে পথচলতি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে রবীন্দ্রসংগীতের সুরে (“বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন…”) সম্প্রীতির যে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, তা কোনো পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতীক ছিল না। সেটি ছিল শাসকের বিভাজন রাজনীতির বিরুদ্ধে এক অখণ্ড জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতীক।
বাঙালির মননে তাই রাখিবন্ধন একই সাথে কলেজের করিডোরে প্রেমের জটিল হিসেবনিকেশ, বাণিজ্যিক প্যাকেজিংয়ের নতুুন রূপ এবং বঙ্গভঙ্গবিরোধী সম্প্রীতি সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক দস্তাবেজ।


