বিশেষ ফিচার প্রতিনিধি, কলকাতা:
শহরের ব্যস্ত রাজপথের পাশে এক টুকরো ইতিহাস এবং অতি যত্নে গড়ে তোলা স্মৃতির সলিল সমাধি। দক্ষিণ কলকাতার ঐতিহ্যবাহী লেক গার্ডেনস অঞ্চলের একটি জরাজীর্ণ পুরোনো বাড়ির পিছনের দেওয়াল সংলগ্ন জঞ্জালের স্তূপ থেকে উদ্ধার হলো নব্বইয়ের দশকের এক বিরল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—যা অবহেলা ও উদাসীনতায় মিশে যেতে বসেছিল আবর্জনার সঙ্গে।
হাতে গড়া অ্যালবাম, সাদাকালো বিরল আলোকচিত্র, নব্বইয়ের দশকের এইচএমভি-র (HMV) ক্যাসেট এবং দুর্লভ সাহিত্যকর্মের এমন পরিণতি এক গভীর সামাজিক ও আত্মিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে কলকাতার প্রাজ্ঞ নাগরিক সমাজের দরবারে।
আরও পড়ুনঃ ট্রাম এর পর ফিরছে অ্যাম্বাসেডর! স্মৃতির নস্টালজিয়া নিয়ে ফিরছে ‘ই-অ্যাম্বাসেডর’
জঞ্জালের স্তূপে জ্বলজ্বলে ইতিহাস
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি লেক গার্ডেনসের ওই ভাঙা বাড়ির দেওয়াল ঘেষা নোংরা, পচা তোষক, ছেঁড়া কাপড় ও ময়লার কাদা-মাখা স্তূপের মধ্য থেকে উঁকি দিচ্ছিল বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া দেব-দেবীর অবিকৃত কিছু পটের ছবি। ধূলিমালিন্যহীন সেই মুখগুলির ঠিক পাশেই পড়েছিল:
-
ভিজে স্যাঁতসেঁতে ফটো অ্যালবাম: চোকলা খসে পড়া এক দামি অ্যালবামের ভিতর যত্নে সংরক্ষিত ইংল্যান্ডের বিভিন্ন প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপের সাদাকালো ছবি। প্রতিটি ছবির নিচে সূক্ষ্মভাবে লেখা রয়েছে স্থান ও তারিখ।
-
সংগীত ও সংস্কৃতির অবশেষ: সুরসাধিকা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠের নব্বইয়ের দশকের এইচএমভি-র ক্যাসেট, যার গায়ে জড়িয়ে ছিল ভেজা বাংলা ও ইংরেজি ধ্রুপদী বইয়ের পাতা।
সযত্নে সাজানো ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও মানুষের জীবদ্দশার বৈদগ্ধ কীভাবে এক লহমায় মহাকালের অমোঘ আবর্জনায় পরিণত হয়, তা প্রত্যক্ষ করে পথচলতি মানুষদের থমকে দাঁড়াতে দেখা যায়।
আরও পড়ুনঃ জমে গেল উপনির্বাচন! ভোটের আগেই জেলমুক্তি নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থীর
স্মৃতি কি তবে কেবলই নশ্বর সম্পদ?
যে শহরে আমরা প্রতিটি ছবি, প্রতিটি পুরোনো চিঠি, খবরের কাগজের কাটিং কিংবা ধুলো জমা প্রিয় বইগুলোকে বুকের গভীরে আঁকড়ে ধরে রাখি—তার শেষ পরিণতি কি শুধুই ফুটপাতের নোংরা জঞ্জাল?
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুমিষ্ট সুর কিংবা বিলাতের প্রাকৃতিক দৃশ্য ধরা পড়া সাদাকালো ছবিগুলোর এই মর্মান্তিক পরিণতি মনে করিয়ে দেয়—মানুষ চলে গেলে তার গড়ে তোলা শৈল্পিক জগত ও অনুভূতিগুলো পরের প্রজন্মের কাছে কতটা অবহেলিত হয়ে পড়তে পারে। ত্রিকালদর্শনের এই নির্মম দৃশ্য দেখে শঙ্কিত ও বাকরুদ্ধ কলকাতার সংস্কৃতিপ্রেমী মহল।


