বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি, কলকাতা:
গত জানুয়ারি মাসে পার্ক স্ট্রিটের এক ঐতিহ্যবাহী রেস্তরাঁয় গোমাংস সংক্রান্ত বিতর্ক ও বেয়ারা গ্রেফতারির ঘটনায় নতুন মোড়। বিধানসভা নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনে বিজেপির জমা দেওয়া খরচের নথিতে দেখা যাচ্ছে, বিতর্ক সৃষ্টিকারী নেটপ্রভাবী (ইনফ্লুয়েন্সার) সায়ক চক্রবর্তীকে দলীয় প্রচার বাবদ আড়াই লক্ষ টাকা প্রদান করা হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— তবে কি পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় মেরুকরণ ও কৃত্রিম ন্যারেটিভ তৈরির জন্যই সেই ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়েছিল?
আরও পড়ুনঃ সাংবাদিকতার তথ্যে নড়ে উঠল নির্বাচন কমিশন; নেপথ্যে কলকাতার মেয়ে ঋতিকা চোপড়া
বিতর্কের নেপথ্য ঘটনা ও রেস্তরাঁ কর্তৃপক্ষের দাবি
গত ৩০ জানুয়ারি পার্ক স্ট্রিটের ৭০-৭৫ বছরের পুরনো এক রেস্তরাঁয় সায়ক ও তাঁর দুই বন্ধু গিয়ে পাঁঠার স্টেকের বদলে গোমাংসের (বিফ) স্টেক পরিবেশনের অভিযোগ তোলেন। নিজেকে ‘ব্রাহ্মণসন্তান’ দাবি করে সামাজিক মাধ্যমে লাইভ করার পর সায়কের লিখিত অভিযোগে গ্রেফতার হন বেয়ারা নসিমুদ্দিন। পরবর্তীতে জামিন পেলেও মামলা এখনও বিচারাধীন।
রেস্তরাঁর ম্যানেজার শেখ তনভীরের বক্তব্য:
“ঘটনার দিন উনি কোনো কথা শুনতেই চাইছিলেন না। কাউকে ফোন করার পরই বিজেপির লোকজন এসে হাঙ্গামা শুরু করে এবং পুলিশের ওপর চাপ তৈরি করে এফআইআর করায়। এখন বিজেপির খরচের তালিকা দেখে স্পষ্ট, কেন এবং কী কারণে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।”
সামাজিক সংগঠন ‘বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ’-এর সদস্যা শতাব্দী দাসও দাবি করেছেন, এই ঘটনাটি যে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে স্ক্রিপ্ট করা ও পরিকল্পনা মাফিক ঘটানো, খরচের তালিকার নথিতে তা পরিষ্কার।
আরও পড়ুনঃ ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর রিপোর্টে তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি; সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে তুমুল বিক্ষোভ
নির্বাচন কমিশনের নথি ও বিজেপির খরচের হিসাব
গত ২৫ অগস্ট নির্বাচন কমিশনে বিজেপির জমা দেওয়া ‘মিডিয়া অ্যাডভার্টাইজমেন্ট অন জেনারেল পার্টি প্রোপাগান্ডা’ শীর্ষক নথিতে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনে প্রচারের উদ্দেশ্যে মোট ৩৬ জন মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অর্থ দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যেই রয়েছে ইনফ্লুয়েন্সার সায়কের নাম, যাঁকে আড়াই লক্ষ টাকা দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাপানউতোর
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের প্রধান দলগুলির মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বাগযুদ্ধে:
| রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দল | বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া |
| কুণাল ঘোষ (মমতা তৃণমূল) | “ইউটিউবারদের টাকা দিয়ে কৃত্রিম ন্যারেটিভ তৈরির বড় কেলেঙ্কারি এটি। টাকা কীভাবে, কেন দেওয়া হলো—তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া দরকার।” |
| অধীর চৌধুরী (কংগ্রেস) | “বিজেপি দেশের সবচেয়ে ধনী দল। বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভাজন ঘটানোর লক্ষ্যেই কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।” |
| ঋজু দত্ত (গণতান্ত্রিক তৃণমূল) | “বিজেপি নিয়ম মেনে খেলে না, তবে তৃণমূলও পিছিয়ে নেই। তৃণমূলে থাকাকালীন আইপ্যাক কার্যালয়ে সাত-আটজন ইউটিউবারকে নিয়ে গিয়েছিলাম শুভেন্দু অধিকারীর নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে।” |
| রাহুল সিংহ (বিজেপি) | “তৃণমূল চুরির পাহাড়ে ডুবে থেকে এখন কাদা ছেটানোর চেষ্টা করছে। নন-ইস্যুকে ইস্যু বানিয়ে দু’দিনের সস্তার প্রচার ছাড়া এটি আর কিছুই নয়।” |
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে সায়ক চক্রবর্তীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি। বিতর্কিত ঘটনার আড়ালে আর্থিক লেনদেনের এই বিস্ফোরক তথ্য এখন রাজ্য রাজনীতির নতুন চর্চার বিষয়।


