দিল্লির পর এবার বাংলায় আছড়ে পড়ল আবগারি দুর্নীতির সুনামি। প্রাক্তন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আমলে রাজ্যজুড়ে চলা কোটি কোটি টাকার ‘মদ কেলেঙ্কারি’ নিয়ে এবার সুর চড়াল ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার।
অভিযোগ, ২০১৭ সালে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অঙ্গুলিহেলনে রাজ্যের মদ নীতিতে এমনভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যাতে মদের পাইকারি ব্যবসায় সরকারের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়।
আরও পড়ুনঃ রাজ্য রাজনীতিতে চাঞ্চল্য; তোলাবাজি মামলায় গ্রেফতার সব্যসাচী দত্ত
আবগারি দপ্তরের একটি অত্যন্ত গোপনীয় রিপোর্টের সূত্র ধরে স্টেটসম্যান সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি, সিন্ডিকেট রাজ রুখতে এবং স্বচ্ছতা আনার অজুহাতে এই নীতি বদল করা হলেও, আদতে এই নীতির আড়ালে পাইকারীদের চাপ দিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পকেট ভরাতে এবং হাজার হাজার কোটি টাকা তোলা তুলতেই গোটা ছক কষা হয়েছিল। সদ্য ক্ষমতায় আসা শুভেন্দু অধিকারী সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব সাফ জানিয়েছেন, এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত কাউকেই রেয়াত করা হবে না এবং প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।
রাজ্যের নবগঠিত মন্ত্রিসভার সদস্য দীপক বর্মন এই দুর্নীতির কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে জানান, আগে মদের দোকানদাররা সরাসরি উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে রাজ্য সরকারের অধীনে একটি নোডাল সংস্থা তৈরি করা হয়, যার নেপথ্যে আসল চালিকাশক্তি ছিলেন খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এর ফলে বিক্রেতাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে কোটার নামে তাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো হয় এবং কথা না শুনলে পুলিশ দিয়ে রেইড করানোর মতো অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হতো।
তিনি স্পষ্ট করেন, নতুন সরকার এই দুর্নীতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং কলকাতা পুলিশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনে রাজ্য পুলিশ ও গোয়েন্দাদের দিয়েই এর নিরপেক্ষ তদন্ত করানো হবে। অন্যদিকে, রাজ্যের মন্ত্রী সুমনা সরকার দিল্লির আবগারি কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, গত ১৫ বছর ধরে বাংলায় এমন কোনো দুর্নীতি নেই যা তৃণমূল করেনি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে মাত্র এক মাসেই মানুষ এই সরকারের ওপর আস্থা রেখেছেন এবং প্রয়োজন মনে করলে মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় এজেন্সির সাহায্যও নিতে পারেন।
আরও পড়ুনঃ মঙ্গলেই অমঙ্গলের সম্ভবনা; নোটিস দিতে কালীঘাটের বাড়িতে CID
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি মদের ব্যবসার আড়ালে যারা এই বিপুল আর্থিক নয়ছয় করেছে, তাদের শিকড় উপড়ে ফেলতে পুলিশ ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় স্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা সমস্ত বেআইনি মদের দোকান বন্ধ করারও নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিকে এই আবগারি দুর্নীতি নিয়ে তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য। সামাজিক মাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় আবগারি দপ্তরকে ব্যবহার করে প্রতি ক্রেট মদ ও বিয়ার থেকে বিপুল টাকা তোলাবাজি করা হয়েছে, যার লভ্যাংশ সরাসরি গিয়েছে তৃণমূল ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তহবিলে।
লোকসভার সাংসদ খগেন মুর্মু এবং প্রবীণ বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা এই ঘটনাকে ‘সরকারি নীতির আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক লুট’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিগত ১৫ বছর ধরে বাংলায় ‘জঙ্গলরাজ’ চালিয়ে যুবসমাজকে মদের নেশায় বুঁদ করে রাখার সুপরিকল্পিত চেষ্টা চালিয়েছিল তৃণমূল, যাতে সাধারণ মানুষের চিন্তাশক্তি লোপ পায় এবং এই বিপুল কালো টাকা দিয়ে কেবল একটি পরিবার লাভবান হতে পারে। আবগারি দপ্তরের এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টটি ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর টেবিলে জমা পড়েছে। বিজেপি নেতৃত্বের হুঁশিয়ারি, নির্বাচনের আগেই দুর্নীতিমুক্ত বাংলার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা রক্ষা করা হবে এবং দোষীরা মাটির তলায় লুকিয়ে থাকলেও তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে।


