২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গে ৩০টি সভা করেছিলেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আরও বেশি। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে ভাঙিয়ে একাধিক নেতাকে বিজেপি-তে টানা হয়েছিল। সে বার স্লোগান ছিল, পরিবর্তন। কিন্তু রেজাল্টে দেখা গেল, বাংলার মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরেই ভরসা রেখেছেন। ৭৭টি আসনে থামতে হয় বিজেপি-কে। বিজেপি-র ভোট শতাংশ ছিল ৩৮।
২০২১ সাল বিজেপি-র কাছে ছিল রাজনৈতিক শিক্ষা। বাংলা দখল করতে গেলে যে নতুন ইমেজ বিজেপি-কে তৈরি করতে হবে, তা মালুম হয় ওই নির্বাচনে। ২০২৬ সালেও স্লোগান সেই পরিবর্তন। তবে এবার দেখা গেল, বিজেপি-র প্রচারেও পরিবর্তন।
আরও পড়ুনঃ ‘এ বার পরিবর্তন করেই ছাড়তে হবে’, পশ্চিমবঙ্গে ভোটপ্রচার শেষে মোদীর অডিয়োবার্তা
পরিবর্তন ১: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা নয়, নিশানায় তৃণমূলের সিস্টেম
২০২১ সালে বিজেপি প্রতিটি প্রচারেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি নিশানা করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রায় প্রতিটি সভাতেই নিয়ম করে ‘দিদি, ও দিদি’ বলেছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মমতাকে সরাসরি নিশানার খেসারত দিতে হয়েছিল বিজেপি-কে। আবেগের ভোট গিয়েছিল মমতার দিকেই।
২০২৬ সালে বিজেপি প্রচারে পরিবর্তন আনল। সরাসরি তৃণমূলনেত্রীকে নিশানা না করে, তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতার ভাইপো তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে টার্গেট করল। অমিত শাহ প্রায় সব সভাতেই দাবি করলেন, ফের তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিলে এবারে পশ্চিমবঙ্গে ‘ভাইপো’ মুখ্যমন্ত্রী হবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন।
পরিবর্তন ২: রাম থেকে মা কালী ও মাছ
২০২১ সালে বিজেপি বাংলায় ঘনঘন জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে যে রাম নামে আবেগ খুব বেশি নেই, তা অচিরেই প্রমাণ হয়ে যায়। ২০২৬ সালে একেবারে বাঙালি সংস্কৃতিকে হাতিয়ার করল বিজেপি। মোদী থেকে শাহ, সকলের মুখে শোনা গেল জয় মাকালী স্লোগান। একই সঙ্গে মাছপ্রিয় বাঙালির মাছ-ভাতকেও হাতিয়ার করল বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিটি প্রচারেই দাবি করলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ, মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবে। পাল্টা বিজেপি নেতারা মাছ নিয়ে প্রচার করলেন, কেউ কেউ মাছ-ভাত খেলেন। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অনুরাগ ঠাকুর খেলেন সর্ষে-ইলিশ। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদী ঝাড়গ্রামে ঝালমুড়ি মাখা খেলেন। আমিষ ভোগ রাঁধা হয়, কলকাতার বিখ্যাত ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে পুজো দিলেন।
পরিবর্তন ৩: বহিরাগত তকমা ঘোচাতে বাংলা ভাষা
তৃণমূল কংগ্রেসের একটা বড় অভিযোগ হল, বিজেপি নাকি ‘বহিরাগত’ দল, তারা বাংলাকে ঠিকভাবে বোঝে না। ২০২১ সালের ভোটে এই অভিযোগের জবাব দিতে বিজেপি তেমনভাবে সফল হয়নি। তবে ২০২৬-এর ভোটে ছবিটা একটু বদলাতে চাইছে বিজেপি। এবার তারা স্থানীয় সংযোগকে বেশি গুরুত্ব দিল। সেই জায়গায় সামনে আনা হয়েছে দলের বর্ষীয়ান নেত্রী ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিকে। পানিহাটির একটি সভায় তিনি সাবলীল বাংলায় কথা বলেন এবং নিজের সঙ্গে বাংলার সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাগচী বাড়ির মেয়ে। তুমি বাংলা বলতে পারো, আমিও পারি। আমার দাদুর বাড়ি এখানে। এই দেশে জন্মেছি, তাহলে আমরা কী করে বাইরের লোক?’
আরও পড়ুনঃ কলকাতায় চূর্ণ “তৃণমূলের দম্ভ”, বঙ্গ জয়ের হুঙ্কার মোদীর
পরিবর্তন ৪: মহিলা ভোটারদের টার্গেট
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র প্রচার স্ট্র্যাটেজিতে বোধ হয় সবচেয়ে বড় বদল এটাই। ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ঘোষণা করেছিলেন। বাংলার মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ৫০০ টাকা করে দেওয়া শুরু করে রাজ্য সরকার। ২০২৬ সালের ভোটের আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা বাড়িয়ে দেড় হাজার করে দিয়েছেন মমতা। বিজেপি-ও সেই মহিলা ভোটারদের টার্গেট করল মমতার অস্ত্রেই। বিজেপি-র প্রতিশ্রুতি, ক্ষমতায় এলে তারা মহিলাদের ৩ হাজার টাকা করে দেবে। একই সঙ্গে আরজি কর কাণ্ডে নির্যাতিতা ডাক্তারের মা রত্না দেবনাথকে প্রার্থী করল বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী থেকে বিজেপি-র রাজ্য নেতৃত্ব, আরজি কর, দুর্গাপুর, সন্দেশখালি, কসবা ল’কলেজের ঘটনা বারবার উল্লেখ করলেন।


