সময় বড় বলবান, আর রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে ক্ষমতার দম্ভ যে কত দ্রুত ধুলোয় মিশে যেতে পারে, বৃহস্পতিবার দুপুরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা দেখল তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। যে নেতার একসময়ের হুঙ্কারে গোটা ফলতা থরথর করে কাঁপত, যাঁর ইশারায় এলাকায় ‘বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত’, সেই একদা দাপুটে তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গীর খানকে আজ এক্কেবারে ভিন্ন রূপে দেখল এলাকাবাসী। পরনে সাধারণ একটা হাফ প্যান্ট, বিধ্বস্ত চেহারা আর চারপাশ ঘিরে রয়েছে পুলিশ, এই অবস্থাতেই বৃহস্পতিবার ফলতার চেনা রাস্তায় ‘প্যারেড’ করানো হলো ফলতার প্রাক্তন ‘ডন’ তথা সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানকে। একদা দাপুটে এই নেতার এই পরিণতি দেখে রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে অনেককেই মুখ টিপে হাসতে দেখা গেল।
আরও পড়ুনঃ অভিষেককে ডিম ছুড়তে এলেন সুদূর দিল্লি থেকে; ছোড়া হল না, আক্ষেপ দিল্লিবাসী উদিতা দাস
‘পুষ্পা’র দম্ভ চুরমার: ভোটের মাঠ থেকে শ্রীঘর
ভোটের মরশুমে বিনোদনের হিট সংলাপ ধার করে জাহাঙ্গীর খান নিজেকে ফলতার ‘পুষ্পা’ বলে দাবি করেছিলেন। প্রকাশ্য সভায় বুক ঠুকে বলেছিলেন, ‘পুষ্পা রাজ, ঝুকেগা নেহি’। কিন্তু সময় বদলাতেই সেই পুষ্পা যে এভাবে পুলিশের খাঁচায় বন্দি হয়ে মাথা নোয়াতে বাধ্য হবেন, তা হয়তো খোদ জাহাঙ্গীরও ভাবেননি।
ঘটনার সূত্রপাত সদ্যসমাপ্ত হাইভোল্টেজ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এবার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ঘাসফুল শিবিরের টিকিটে দাঁড়িয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। কিন্তু ভোট ঘোষণার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ভোটারদের ভয় দেখানো, বিরোধী কর্মীদের মারধর, বুথ দখল এবং দেদার রিগিংয়ের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। পরিস্থিতি এতটাই হাতের বাইরে চলে যায় যে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ডায়মন্ড হারবার ও ফলতা এলাকার আইনশৃঙ্খলার রাশ টানতে উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের ‘সিংঘাম’ বলে পরিচিত দুঁদে আইপিএস অফিসার অজয় পাল শর্মাকে স্পেশাল অবজার্ভার হিসেবে পাঠানো হয়।
আইপিএস অজয় পাল শর্মা দায়িত্ব নিয়েই অ্যাকশন মোডে চলে আসেন। স্বয়ং জাহাঙ্গীরের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে আসেন এই পুলিশকর্তা। এরপর কমিশনের নির্দেশে গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের (Re-polling) ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারিতে পুনর্নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হতেই কার্যত রণে ভঙ্গ দেন জাহাঙ্গীর খান। ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। ফলতা কেন্দ্রে বিপুল ভোটে জয়ী হয় বিজেপি।
নেপাল সীমান্ত থেকে গ্রেফতার ও হাফ প্যান্টের ‘তদন্ত’
ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই এলাকাছাড়া ছিলেন জাহাঙ্গীর। তাঁর বিরুদ্ধে ফলতা ও ডায়মন্ড হারবারের বিভিন্ন থানায় খুনের চেষ্টা, তোলাবাজি, বোমাবাজি এবং অস্ত্র আইনের একাধিক ধারায় একগুচ্ছ মামলা দায়ের হয়েছিল। পুলিশ তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল। অবশেষে দিনকয়েক আগে ভারত-নেপাল সীমান্তের পানিট্যাঙ্কি এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়ে থাকার সময় তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

বর্তমানে আদালতের নির্দেশে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন এই প্রাক্তন তৃণমূল প্রার্থী। বৃহস্পতিবার দুপুরে মামলার তদন্তের স্বার্থেই এবং বিভিন্ন ঘটনাস্থল পুনর্নির্মাণের জন্য কড়া নিরাপত্তায় জাহাঙ্গীর খানকে ফলতায় নিয়ে আসে পুলিশ। তবে কোনো রাজকীয় পোশাকে নয়, তাঁকে পরানো হয়েছিল একটি সাধারণ হাফ প্যান্ট। সেই অবস্থাতেই ফলতার রাস্তায় তাঁকে হাঁটিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ।
আরও পড়ুনঃ রেহাই নেই চোর অভিষেকের; এবার ডিজে বাজবে’ বলার মামলাতেও CID তদন্ত
মুখ টিপে হাসল ফলতা
যে জাহাঙ্গীর খানের নাম শুনলে কিছুদিন আগেও ফলতার সাধারণ মানুষ আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকতেন, তাঁকে এভাবে হাফ প্যান্ট পরে পুলিশের হাত ধরে হাঁটতে দেখে এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ এক লহমায় বদলে যায়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বহু সাধারণ মানুষ, দোকানদার এবং পথচারীদের এই দৃশ্য দেখে মুচকি হাসতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষের বক্তব্য, “আইনের হাত যে কত লম্বা, তা আজ প্রমাণ হয়ে গেল। যে মানুষটা নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবত, আজ তার এই দশা দেখে শিক্ষা নেওয়া উচিত।”


