রাতভর টুপটাপ বৃষ্টি শেষে ভোরের আলো যখন আলতো করে গ্রামগুলোর বুক ছুঁয়ে উঠল, তখন মনে হল, দূর আকাশ থেকে কেউ যেন কোনও রহস্যময় পর্দা নামিয়ে দিয়েছে চারদিকে। ভিজে মাটির গন্ধের মাঝে, কাদাজলে ভরা পথ পেরিয়ে চোখে পড়ে এমন এক দৃশ্য, যা বাস্তবের থেকেও বেশি স্বপ্নের। গাছের ডালে ডালে ঝুলে আছে সাদা কোকুনের মতো অদ্ভুত আস্তরণ। কিন্তু সত্যিটা আরও অবাক করার মতো। এই সমস্ত জাল বুনেছে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র মাকড়সা, বন্যার জল থেকে প্রাণ বাঁচাতে।
আরও পড়ুনঃ বড় অঘটন ঘটতে পারত, ভয়াবহ পরিস্থিতি; জেলে নৃশংস মার খেয়ে বেহাল অবস্থা ধৃত জঙ্গির
সালটা ২০১১। ভয়াবহ বন্যা দেখল পাকিস্তান। দিনের আলো একটু জোরালো হতেই দেখা গেল, যে গাছগুলো বন্যার আগে এক্কেবারে সবুজ ছিল, সেগুলো যেন নরম সাদা তুলোয় মোড়া। পাতার পর পাতা, ডালের পর ডাল জুড়ে এক অদ্ভুত স্বপ্নময় সাদা স্তর। দূর থেকে দেখলে মনে হবে বিশাল কোনও কোকুন ঝুলছে কানায় কানায়। এ কেমন ‘ভূতুড়ে’ গাছ? এল কোথা থেকে?
পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যায় যখন ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছিল, তখন শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতির ক্ষুদ্র প্রাণীরাও খুঁজতে লাগল বাঁচার পথ। বন্যার জল উঠে যেতে যেতে যখন মাঠ, রাস্তা, ঝোপঝাড় সব গিলে নিল, তখন লক্ষ লক্ষ মাকড়সা আশ্রয়ের খোঁজে উঠে গেল গাছে।
কিন্তু জল কমছিল না। দিন যায়, রাত যায়, তবুও নামার সুযোগ নেই। এই দীর্ঘ অপেক্ষাতেই তারা বুনতে শুরু করল জাল। একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে জুড়ে তৈরি হল বিশাল সাদা আবরণ। যেন একটা গাছ পুরোটা হয়ে উঠল ‘ভূতুড়ে’।
আরও পড়ুনঃ গেট নম্বর ১৪-A; কলকাতা বিমানবন্দরে হাড়হিম ঘটনা
অদ্ভুত এই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অনন্য উপকার। এত মাকড়সা একসঙ্গে গাছে আশ্রয় নেওয়ায় এলাকায় মশার সংখ্যা প্রচুর কমে যেতে শুরু করল। আর মশা কমে যেতেই ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিও কমতে থাকল। মানুষ যখন ঘরহারা, জীবন যখন অনিশ্চয়তায় ভরা, তার মাঝেও প্রকৃতি কোনওভাবে নিজের মতো করে সামান্য সান্ত্বনা পাঠিয়ে দিল।
পাকিস্তানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা ডুবে গিয়েছিল জলের তলায়। ভাঙা ঘরবাড়ি, ধ্বংস হওয়া রাস্তা, ডুবে যাওয়া স্কুল, নষ্ট ফসল সব মিলিয়ে যেন শতকোটি মানুষের জীবনে নেমেছিল অন্ধকার। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ভূতুরে’ গাছটা একটা কথাই মনে করিয়ে দেয়—সমস্ত প্রাণী টিকে থাকার পথ খুঁজে নেয় নিজেই।









