Friday, 17 April, 2026
17 April
HomeকলকাতাSalil Chowdhury: "পৃথিবীর গাড়ি তা থামাও"; সময়ের তুলনায় ১০০ বছর এগিয়ে

Salil Chowdhury: “পৃথিবীর গাড়ি তা থামাও”; সময়ের তুলনায় ১০০ বছর এগিয়ে

১৯৪৪-এ সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দেন।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

ভারতরত্ন লতা মঙ্গেশকর ও সংগীতস্রষ্টা সলিল চৌধুরী দুজনে যেন একই আকাশের চন্দ্র-সূর্য, অনায়াসে একে অপরের পরিপূরক। ‘সলিল চৌধুরী রচনা সংগ্রহ’ বইটির ভূমিকা লিখতে গিয়ে লতা মঙ্গেশকর সলিলবাবুকে বিরলদের মধ্যে বিরলতম বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর সুরারোপিত অনেক জনপ্রিয় গানে কণ্ঠ দিয়েছেন লতা। এর মধ্যে বাংলা গান ৪৬টি। ভারতীয় সংগীতজগতের সৌভাগ্য যে লতা ও সলিল প্রায় একই সময়ে জন্মেছিলেন। নইলে অনেক মূল্যবান গান হয়তো সৃষ্টিই হত না।

সলিল চৌধুরীর জন্ম ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর। ১৯৪৪-এ সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দেন। ১৯৪৯-এ ‘গাঁয়ের বধূ’ রেকর্ড প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তাঁর সাড়া জাগানো আবির্ভাব। ১৯৫৩-তে ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিতে সুরারোপ করতে মুম্বই পাড়ি দেন। এরপরে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শতাধিক চলচ্চিত্রে সুরারোপ করেছেন। বাংলা, হিন্দি সহ বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় তাঁর উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক অবদান মনে দাগ কাটার মতো। গীতিকার ও সুরকার হিসেবে সলিল চৌধুরীর বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ড বাংলা আধুনিক গানকেও সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৫৮-তে বোম্বে ইউথ কয়্যার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি ভারতীয় সংগীতে সেকুলার কয়্যার ও পলিফোনিক কণ্ঠের ব্যবহার শুরু করেন। সংগীতসৃজনে নিবেদিতপ্রাণ ও বহুমুখী সাহিত্যপ্রতিভায় দীপ্ত এই বিরল ব্যক্তিত্বের কর্মজীবনের অবসান ঘটে ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার গাজিপুর গ্রামে জন্ম হলেও তাঁর প্রথম জীবনের বহুদিন কেটেছে অসমের একরাজান চা বাগানে। সেখানে তাঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ চৌধুরী চাকরি করতেন। জ্ঞানেন্দ্রনাথবাবু পেশায় চিকিৎসক হলেও নেশায় ছিলেন একজন সুদক্ষ সংগীতজ্ঞ। তাঁদের পারিবারিক সংগ্রহে ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা ধরনের সংগীতের রেকর্ড। তাই সিম্ফনি, বিঠোফেন, মোৎসার্ট তাঁর কাছে বিদেশি সংগীত মনে হয়নি। অন্য দিকে, অসমের চা বাগানের কুলিকামিনরা ছিল তাঁর খেলার সঙ্গী। তাঁদের লোকায়ত গান শৈশবের সলিলকে ভরিয়ে রাখত।

আরও পড়ুনঃ কলকাতার প্রথম দালালরা; ব্রিটিশ বাণিজ্যের নেপথ্য নায়ক

পারিবারিক সূত্রে ১৯৩৩-এ প্রথমে কলকাতায় ও পরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোদালিয়ায় থাকতে শুরু করেন। সেখানেই তাঁর প্রথাগত শিক্ষার হাতেখড়ি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রথম পাঠ। সংগীত পরিচালক নিখিল চৌধুরী ছিলেন তাঁর জেঠতুতো দাদা। নিখিলবাবুর বাড়িতে মিলন পরিষদ নামে অর্কেস্ট্রা ছিল। সেখানে পিয়ানো, তবলা, বাঁশি, বেহালা, এসরাজ, সেতার, গিটার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হন সলিল। কোনও গুরুর কাছে কোনওদিন প্রথাগত তালিম নেননি। অথচ আট বছর বয়সেই বাঁশি বাজিয়ে তিনি সবাইকে মোহিত করে দিতে পারতেন। বঙ্গবাসী কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। সাংগীতিক জীবনের সূচনায় তিনি নিজেকে গীতিকার ও সুরকার হিসেবে গড়ে তোলেন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তাঁর দ্বিতীয় পর্বের উন্মেষ। পেশাদারি সংগীতসৃজনের জগতে এক বলিষ্ঠ কম্পোজার হিসেবে জ্বলে উঠলেন তিনি।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে পরিবর্তিত গণরুচির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারলেন না। সংগীতে নিম্নভাবনার চটুলতাকে তিনি প্রশ্রয় দিলেন না। ক্ষণস্থায়ী উদ্দীপনা তাঁর কাছে অনভিপ্রেত ছিল। সংগীতের হৃদয়গ্রাহী স্থায়ী আবেদনই তাঁর লক্ষ্য। সেই জায়গা থেকে তিনি বিচ্যুত হতে চাননি। তাই ফিরে এলেন কলকাতায়। তৈরি করলেন সংগীত গবেষণার ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর মিউজিক রিসার্চ’। ‘একটু চুপ করে শোনো’ শিরোনামে এখানকার প্রথম রেকর্ড। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কোনও ঠুনকো সুর ও চাতুরির সঙ্গে সমঝোতা করেননি তিনি।

দীর্ঘ সংগীতজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি স্তরে পেয়েছেন প্রচুর পুরস্কার ও সম্মাননা। ১৯৫৮-তে তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। ১৯৭৩-এ বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের পুরস্কার, ১৯৮৫-তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আলাউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৮৮-তে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমির সম্মান ও ১৯৯০-এ মহারাষ্ট্র গৌরব পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মানে ভূষিত করেছে। খাদ্য আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জরুরি অবস্থা জারি– বড় মাপের এমন রাজনৈতিক ঘনঘটায় সলিল চৌধুরী ছিলেন প্রথম সারির প্রতিবাদী শিল্পী। এজন্যই তাঁর প্রেমের গানেও উঠে এসেছে সামাজিক দায়বদ্ধতার বাণী। ‘আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমে’ গানটি তাঁর এই ভাবনারই উৎকৃষ্ট ফসল।

প্রায় ৬০টি হিন্দি ছবি ও ৪৫টি বাংলা ছবিতে সুরারোপ করেছেন সলিল। ২৫টি মালয়ালম ছবি সহ বেশ কিছু তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মারাঠি, গুজরাটি, অসমিয়া ও ওডিয়া ছবিতে স্বচ্ছন্দ সুর বসিয়েছেন। ‘মধুমতী’,  ‘জাগতে রহো’, ‘ছায়া’, ‘আনন্দ’ প্রভৃতি হিন্দি ছবি, ‘একদিন রাত্রে’, ‘মর্জিনা আবদুল্লা’, ‘কিনু গোয়ালার গলি’ প্রভৃতি বাংলা ছবি ও ‘চেম্মিন’-এর মতো মালয়ালম ছবিতে সলিল চৌধুরীর সংগীতায়োজন চলচ্চিত্র-সংগীতের ইতিহাসে চিরকালীন জায়গা করে নিয়েছে। গান ছাড়াও শুধু সাংগীতিক যন্ত্রানুষঙ্গের আয়োজনে বিআর চোপড়ার ‘কানুন’ বা ‘ইত্তেফাক’-এর মতো ছবিতে জ্বলন্ত স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। দেশের প্রথম সারির বহু দিকপাল শিল্পী তাঁর গান গেয়েছেন। লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি, মুকেশ, কিশোরকুমার, আশা ভোঁসলে, জেসুদাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরী, অন্তরা চৌধুরী, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সুচিত্রা মিত্র, মান্না দে, দেবব্রত বিশ্বাস, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লা, নির্মলা মিশ্র, সুবীর সেন, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় প্রমুখের কণ্ঠে সলিল চৌধুরীর গান অমর হয়ে থাকবে।

অ্যারেঞ্জমেন্টের বিষয়ে ভীষণ নিষ্ঠাবান ছিলেন সলিলবাবু। পরীক্ষানিরীক্ষা করে একেবারে নিখুঁত সুর বের করে আনতেন। রেকর্ডিংয়ের সময় যন্ত্রশিল্পীরা তাই অতি সতর্ক থাকতেন। কেউ ঠিকঠাক বাজাতে না পারলে তিনি নিজেই বাজিয়ে দিতেন। কিন্তু কোনও বকাঝকা করতেন না। একবার ‘রায় বাহাদুর’ ছবিতে ‘সবই পেয়েছি তবু’ গানটি রেকর্ডিংয়ের সময় অ্যাকোর্ডিয়ানবাদক দেরি করে আসেন। নোটেশন দেখে সঙ্গে সঙ্গে সলিল চৌধুরীর কম্পোজিশন তোলা সহজ নয়। তাই সেই বাদক আধ ঘণ্টা ধরে মিউজিক পার্ট তুললেন। সলিলবাবু শান্ত হয়ে অপেক্ষা করে গেলেন। আর একবার মুম্বইয়ে ধীরাজ নামে এক নতুন মিউজিশিয়ান অ্যাকোর্ডিয়ান বাজাতে আসেন। কিন্তু রেকর্ডিংয়ের সময় তাঁর যন্ত্রের ডি-শার্প নোটটা ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সলিলবাবু এমনভাবে কম্পোজিশন বদলে দিলেন যাতে ওই রিডটি আর বাজাতে না হয়।

আরও পড়ুনঃ ২০২৫ সালের International Men’s Day থিম প্রকাশ—বার্তা দিচ্ছে বিশ্ব?

গণসংগীত হিসেবে এক ঝাঁক অমূল্য রত্ন উপহার দিয়েছেন সলিল। ‘অবাক পৃথিবী’র সুরারোপ করতে গিয়ে তিনি অন্তত একশোবার কবিতাটিকে আবৃত্তি করেছেন। গানটির মধ্যে বিদ্রোহের অনুষঙ্গ তৈরি করার সময় এক অনন্য অভিনবত্ব এনেছেন। ‘রানার’ গানটি তৈরিতেও এক অদ্ভুত বিচিত্রতা ধরা পড়েছে। গানটির মধ্যে স্থায়ীতে ফেরার ব্যাপার নেই। গানটিতে ছয়বার ষড়জ পরিবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ ‘সা’-এর অবস্থান বারবার বদলে যেতে যেতে রানার তার গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। ‘পালকির গান’-এর ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছে। তাই শুধু গলা মেলানো নয়, গণসংগীতের প্রকৃত শিল্পী হতে গেলে সংগীতদক্ষতা থাকাও জরুরি। কেউ গণ আন্দোলনে সক্রিয় হলেই গণসংগীত নির্মাণ করতে পারবেন তা নয়।

সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ পূর্তিতে তাঁর কন্যা অন্তরা চৌধুরীর অভিব্যক্তি, ‘আমার বাবা সময়ের তুলনায় একশো বছর আগেই জন্মেছিলেন।’ সত্যিই তা-ই। সলিল আজও ব্যতিক্রমী, আজও নির্বিকল্প, আজও মৌলিক। তাঁর গানগুলি সলিল সংগীত হিসেবে ইদানীং পৃথক মর্যাদা পাচ্ছে। মূলত পারিবারিক উদ্যোগেই তাঁর সৃজনসম্ভারকে সংরক্ষণের ব্যবস্থার কাজ চলছে। শতবর্ষে সলিল-অনুরাগী শিল্পীরা একক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধানৈবেদ্য উৎসর্গ করছেন বছরভর। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমেই অঞ্জলি নিবেদন করছেন। ১৯ নভেম্বর তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। দেশজুড়েই তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন