Thursday, 16 April, 2026
16 April
Homeদক্ষিণবঙ্গBakreswar: বীরভূমের বুকে প্রথম এত বড় চিমনি! ৩৪ বছরে বামেরা কিছুই করেনি!...

Bakreswar: বীরভূমের বুকে প্রথম এত বড় চিমনি! ৩৪ বছরে বামেরা কিছুই করেনি! ভুলে গেলে চলবে

বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রর নিরাপত্তারক্ষীরা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতর থেকে লোহার পাত পাচার করার চক্র ধরে ফেলেছিল ২০০৯ সালে।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

চন্দন দাসঃ

তখন ভরপুর বাম আমল। তখনও সরু রাস্তা, তবে খন্দহীন এবং তোলার টোলহীন।

তখন বাস চলতো ঘন্টায় ২০ কিমি বেগে। সরকারি বাস ২৫ কিমি।তখন সরকারি অফিস আমলার জীপ গাড়ি। ডিএম সাহেবের সাদা ট্যাক্সি। তখন বিরোধীরা বেঁচে খবরের কাগজে।তখন ধর্ম মানে প্রতি বাড়ির ঠাকুরঘরে।তখন বীরভূমের সদর সিউড়ি আসতে একদল বাসে চড়তো আর বেশিরভাগটাই অন্ডালের ট্রেনে চড়ে আসতো। তখন সিউড়ি মানে নাটকের শহর।কত না গ্রুপ থিয়েটার! সিউড়ি মানে জেলা স্কুলের নজরকাড়া পরীক্ষার ফল। খেলা মানে ইরিগেশনের মাঠ। তখন সিউড়ি মানে কংগ্রেস, কংগ্রেস মানে সোনাদা, সোনাদা মানে সুনীতি চট্টরাজ।

তখন সিউড়িতে পুরোনো সার্কিট হাউসকে সাজানো চলছে, একসময় সাঁওতাল বিদ্রোহীদের বিচারালয়কে সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মারক দিয়ে সাজাচ্ছেন অরুণ চৌধুরী, তপন রায়রা। তখন সিউড়িতে জেলা প্রশাসনের মুখ মানে ব্রজ মুখার্জি। বিরোধীরাও তাঁর কাছে তাঁর ঘরে ঢুকে পড়ে এটা ওটা চাহিদা ধমক সব খেয়ে ছোলা মুড়ি আর লাল চা খেয়ে ফিরে বলতো, ‘লোকটো কাজের লোক বটে’। সেই সময় সিউড়িটা যেন পুরুলিয়া। অবিন্যস্ত শহর।

আরও পড়ুনঃ পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজ্ঞাপনের জন্যে ৩০ কোটি টাকার খরচ!

তখন মাদ্রাসা মোড়ে একটা পাঞ্জাবী হোটেল, আর রাস্তার ওপর একটা পেট কেমন করা হোটেল। জেলা শাসকের অফিসের সামনে এক মিষ্টির দোকান।  সিপিএমের মিছিল দেখলে রাগে মালিক গরম জল ছুড়তেন,  সেই আমলেও। তবে পাল্টা ঢিল আসতো না।

তখন সিউড়ি  বাসস্ট্যান্ডেও শুনশান, কয়েকটা সরকারি বাস।  কয়েকটা মোরব্বার দোকান, অল্প কিছু ভাড়ার গাড়ি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে। তখন জেলা পরিষদের ব্যাট ধরেছেন ব্রজ মুখার্জি আর মাষ্টারমশাই রঞ্জিত দত্ত। যাঁর রসবোধ এবং পাণ্ডিত্য দেখে কলকাতা থেকে খবর করতে আসা প্রথম শ্রেণির এক নামজাদা লেখক হতবাক হয়ে কয়দিন থেকেই গেলেন।

সেই বীরভূমে শুরু হলো বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ নির্মাণের কাজ। সিউড়ি চাঁদমারি মাঠে সভায় উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইলেন শান্তিদেব ঘোষ। মঞ্চে জ্যোতি বসু, বিনয় চৌধুরী, প্রবীর সেনগুপ্ত, অসীম দাশগুপ্ত, সোমনাথ চ্যাটার্জি,  শ্যামল চক্রবর্তী, সুভাষ চক্রবর্তী, রবীন দেবরা।

সদাইপুরের মাঠে হলো শিলান্যাস। এখন যা কার্যত পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয়েছে।

সভা শেষে জ্যোতি বসু বললেন, ‘‘ব্রজবাবু দায়িত্বটা বিরাট, আপনারা অনেক কিছু করতে পেরেছেন এবারেও জিততে হবে, সবাই তাকিয়ে আছে আপনাদের দিকে।’’ ব্রজ মুখার্জি হাসেন, ‘‘ভাববেন না আজ থেকেই কাজ শুরু।’’ এরপর ছবিটা বদলাতে থাকলো।

রাজ্যজুড়ে এসএফআই, ডিওয়াইএফআই’র রক্তদান আর স্বেচ্ছাশ্রম এক আবেগ ছড়ালো। কলকাতা সহ হরেক জেলা থেকে বাসে করে আসছেন ছাত্র-যুবরা। তাদের কি কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন ব্রজ মুখার্জি। অনভিজ্ঞ তারা মাটি কাটতে। শুরু হলো পাঁচিল তৈরি দিয়ে। কেউ কোদালে মাটি কাটছে, কেউ সে মাটি দূরে নিয়ে ফেলছে। একদল ঘাস জঙ্গল পরিষ্কার করছে। রোজ কয়েকশ স্বেচ্ছাসেবক আসছেন, আর কাজ করছেন। আসতেন কৃষক সভার কর্মীরা। মাটি কাটায় পারদর্শী তাঁরা। মাটি কেটে তাঁরা অনেকে খোলা মাঠে থেকে যেতেন।  কালো কোঁড়া ছিলেন কৃষক নেতা, তিনি নিজেও মাটি কাটতেন। বিকেলবেলায় দূরে একটা পুকুরে সবাই স্নান করে নিজেরা ভাত আর আলু সেদ্ধ পিয়াজ চটকে চোখা আর ডাল বানাতেন। কয়েক শ মানুষ, সেই খাবারেই কি তৃপ্তি। কালো কোঁড়া একাই নাকি এককেজি চালের ভাত খান। এটা বাইরের কেউ জেনেছে শুনলেই লজ্জায় পড়ে যেতেন। রাতভর খোলা মাঠে কাটিয়ে সূর্য ওঠার সাথে আবার কাজ শুরু। কোন মজুরী নেই, কোন নির্দেশ নেই ভালোবাসার কাজ।  লিউ শাউ চি কি মাঝরাত্তিরে এদের কানে কানে কিছু বলে যেত?  এরাই জানেন। এ মানুষগুলো এখনো আছেন।

অফিসের জরুরী কাজ সেরেই টিম ব্রজ মুখার্জি বক্রেশ্বরের মাঠে। সেখানে দলের নেতা মহম্মদ সেলিম, সাধন ঘোষরা কর্মীদের সাথে মিশে আছেন। দিনভর কাজ। জেলা পরিষদ একটা টিউবয়েল করে দিল, সঞ্জীব সমাদ্দার জেলা পরিষদের ইঞ্জিনিয়ার পড়ে থাকলেন মাঠে।

রাতদিন কাজ। এত এত কাজ। কত কত বরাত। কাটমানির প্রশ্ন নেই। এত মানুষ কাজ করছে খাবার জল নেই। কাছেপিঠে দোকান নেই। সেই মুড়োর মাঠ, নাহলে চিনপাই যেতে হতো কিছু কিনতে। স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ দেখে হতবাক লাগোয়া গ্রামের মানুষরা। তাঁরা নিজেরাও হাত লাগালেন। কেউ এনে দিলেন শশা, কেউ মুড়ি, এভাবে চলতে চলতে শুরু হলো পাঁচিল তৈরির কাজ। ভরদুপুরে ঠাঠা রোদ্দুর সাইকেল নিয়ে দূর ড্যাম এলাকা থেকে ফিরলেন প্রবীর সেনগুপ্ত। তিনি বিদ্যুৎমন্ত্রী। সাফারি পড়া, কানে টকব্যাক, হাতে মেশিনগান নেওয়া সিকিউরিটি নেই, হুটার বাজানো পুলিশ জীপ নেই। হয়তো রাত কাটাতে ব্রজ মুখার্জির সাথে সিউড়ি জেলা পরিষদের বাংলো। সকাল হতেই কাজ। এভাবেই একটা একটা করে ইট জুড়ে গড়ে উঠলো প্রশাসনিক ভবন। শুরু হয়ে গেল প্রযুক্তির কাজ।  গড়ে উঠলো উপনগরী।

এলেন সুভাষ পাখিরা সহ একদল উদ্যমী কর্মী। পরবর্তীকালে মন্ত্রী শঙ্কর সেন এলেন, এলেন প্রশান্ত নন্দী চৌধুরীরা।  প্রযুক্তিবিদরা দল বেঁধে এলেন জাপান থেকে। শুরু হলো একের পর এক নির্মাণ। দেশের সব নামজাদা সংস্থা ভেল, লার্সেন টুব্রো, সিমেন্স, অ্যাফকনস-কে নেই সেখানে! একের পর এক সংস্থা কাজ শুরু করলেন। তাঁরা থাকতে শুরু করলেন সিউড়িতে। বদলে গেল রুখা সিউড়ি।

অন্ধ বামবিরোধী সুবিধাবাদী রাজনীতির বা ধান্ধার পীঠস্থান, যেখানে নেতারা বলতেন বক্রেশ্বর হলে তাদের হাতের তালুতে চুল গজাবে, তারাই বক্রেশ্বর প্রকল্পে গাড়ি ভাড়ার ব্যাবসা দিয়ে পা রাখা শুরু করলেন। সিউড়ি ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে গোটা শহর নতুন ভাড়াটিয়া নতুন বিনিয়োগে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। বলা চলে, বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দৌলতে মৃতপ্রায় সিউড়ি শহর নতুন যৌবন ফিরে পেল।

সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় পানাগড় মোরগ্রাম জাতীয় সড়ক গড়লেন। রেলপথের শোচনীয় হাল কাটাতে সাংসদ রামচন্দ্র ডোম, রেলের সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান বাসুদেব আচারিয়া, আর রেলের অধিকারিকদের এনে সিউড়ির সমস্ত অংশের প্রতিনিধিদের সাথে সরাসরি আলোচনা করালেন। রেলের উন্নয়ন নিয়ে এমন আলোচনা সিউড়ির ইতিহাসে আর নেই। বলা চলে সবটাই বক্রেশ্বরকে সামনে রেখে হলো।

একের পর এক ইউনিট, একের পর এক বিজয়। যে দিল্লি বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ নির্মাণের অনুমোদনই দেয়নি সেই দিল্লিতে উদ্বৃত্ত  বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলো বক্রেশ্বর।

তিনটে ইউনিট পুরোদমে, গোছানো সংসার, তখন সরকার বদল হলো। এরপর জ্যোতিবাবুর উদ্বোধন করা ফলক ঢেকে গেছে আগাছায়। অনেক চাপের মাঝেও অনড় থেকে বক্রেশ্বরকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন কর্মীরা। আজ দেশের সেরা হয়েছে বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেছে।

এতবড় প্রকল্পের উদ্বোধন যেভাবে তড়িঘড়ি করে সেরে ফেলা হয়েছিল তা ছিল হতাশাজনক। ব্রজ মুখার্জিরা বলেন, সে বাজারে কয়েক লক্ষ টাকার আর্থিক সাশ্রয় হয়েছিল স্বেচ্ছাশ্রমে। এত রক্তদান, সঞ্চয় দান, সম্পত্তি দান-এসবে তো প্রকল্প পুরো হওয়ার গল্প নেই, তবে এই দান সহায়ক শক্তি হয়েছিল। অনেকে আত্মত্যাগ, অনেক আবেগ, স্বপ্ন, শ্রম, সব মিলেই বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। যে রাত্রে প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদন পরীক্ষামূলক ভাবে শুরু হলো, সেদিন কর্মীরা আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন। তাঁদের সাথে আবেগে মিশেছিলেন জাপানের প্রযুক্তিবিদরা। এতবড় প্রকল্প। বীরভূমের বুকে প্রথম এত বড় চিমনি। এত মানুষের কাজ। কটা সিপিএম চিরকুটে কাজ পেয়েছে এখানে? অনেক আবেদন আসতো। পরিচালকরা বলতেন, এটা চেয়ারে কলম চালানোর চাকরি নয়, যোগ্যতা, মেধার পরীক্ষায় সফল হয়ে তবেই এসো।

আরও পড়ুনঃ পালানোর পথ নেই; কমিশনের বিশেষ নজর উত্তরবঙ্গে

এখন ভাবুন, এ জমানায় যদি এমন অসম্ভব হতো! তখন যারা বলতেন, ওটা কি করেছে সিপিএম? ওটা তো জাপানের টাকায় তৈরি। চিন, জাপান, সব সিপিএম, ওরা ব্যবসা করতে এটা করেছে। এখন তারাই বলেন, আমাদের দিদি বক্রেশ্বরটা করেছে বলেই লোডশেডিং নেই। সত্যি ভাবতে তো দোষ নেই, তাই ভাবুন না তৃণমূল আমলে এমন শিল্প হলো। দিদি গোটা বলিউড টলিউড এনে পেয়ার কা ঝটকা জোরসে লাগা একমাস ধরে করালেন। কাগজে টিভিতে তাঁর মুখের বিজ্ঞাপন ছ’মাস। আর তার সাথে ময়দানে কত কত সমাজসেবী।

এখানে চাকরি দেব বলে ১৫ লাখ কতজন নিতেন? এখানে সমাজসেবী কুন্তল, শান্তনু কতজন থাকতেন? তারা ছিলেন না তাই বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ হয়েছিল। তারা থাকলে কি হতো জানেন?

বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রর নিরাপত্তারক্ষীরা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতর থেকে লোহার পাত পাচার করার চক্র ধরে ফেলেছিল ২০০৯ সালে। পুলিশ তদন্ত করে তার মাথাকেও ধরে। এরপর সে চুরি স্বীকার করে। তার জেল হয়। ২০১১ সালের পর সেই জেলফেরত চোর হয়ে যান তৃণমূলের ব্লক সভাপতি। তিনি হয়তো এবার বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ নির্মানের বিষয়ে কিছু গম্ভীর ভারী বক্তব্য শোনাবেন জাতির উদ্দেশ্যে।

তৃণমুল ক্ষমতায় তাই এখানে এখনও চাপ আছে। এখানে এখনও দখল করে নেওয়ার হুমকি আছে। প্রশাসনিক অচলায়তনের ছায়া চিমনির গায়ে পড়ছে। তবুও তো সেরা। যার প্রতিটি ভিত জুড়ে ‘বাঙালী বাচ্চা’দের আবেগ স্বপ্ন ভালোবাসা ভরাতাঁরা বক্রেশ্বর দেশের সেরা শুনে গোপনে আনন্দ পেতেই পারেন।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন