চিত্রালীর প্রতিনিধি হয়ে ১৯৬২ সালে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম সাক্ষাৎকার নেন সাইদা খানম। সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগে সাইদা খানম চিত্রালীর সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজকে বললেন, ‘কলকাতায় যাব। সত্যজিৎ রায়ের একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই।’ এস এম পারভেজ এতে খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না। শুধু মিটমিট করে হাসলেন। সাইদা খানম কলকাতায় গিয়ে বন্ধুদের কাছে শুনলেন, সত্যজিৎ খুবই দাম্ভিক আর রাশভারী মানুষ। বেশি কথা বলেন না; ছবিও তুলতে দেন না। শুনে মনটা দমে গেল। তারপরও আশা-নিরাশার মাঝে দুরু দুরু বুকে ফোনের ডায়াল ঘোরাতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে গম্ভীর এক কণ্ঠস্বর। পরিচয় দিতেই সত্যজিৎ দুই দিন পর সময় দিলেন।
হেমন্তের শেষ বেলায় সত্যজিৎ রায়ের লেক টেম্পল রোডের তিনতলা বাড়িতে হাজির হলেন সাইদা খানম তিনদিন পর। দেখলেন, ঘরের দরজাটা একটুখানি ফাঁকা। সাদা শাল জড়িয়ে সত্যজিৎ লিখছেন। সত্যজিৎকে দেখে ঘাবড়ে গেলেন তিনি। ভাবলেন, বিশ্ববিখ্যাত এই পরিচালকের সাক্ষাৎকার নিতে আসেন দেশ-বিদেশের নামীদামি সাংবাদিকেরা। সেই তুলনায় তিনি অতি নগণ্য। সত্যজিৎ তার উপস্থিতি টের পেয়ে তাকে ঘরে আসতে বললেন। একনজর দেখে ‘বসুন’ বলেই আবার লেখায় ডুবে গেলেন। কয়েক মিনিট পর মুখ তুলে তাকালেন। মেয়েটি যে নার্ভাস, বুঝে গেছেন সত্যজিৎ। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার সম্পর্কে কী জানতে চান আপনি?’
সত্যজিতের সহজ প্রশ্নে সাইদা খানমের আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। সাইদা খানম পথের পাঁচালী বা অন্য কোনো প্রসঙ্গ তুললেন না। সত্যজিৎ রায় কয়েক দিন আগে কাঞ্চনজঙ্ঘার শুটিং শেষ করে দার্জিলিং থেকে ফিরে এসেছেন। সাইদা খানম বুদ্ধি করে বললেন, ‘আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবির কাহিনি শুনতে চাই। সত্যজিৎ ধীরে ধীরে কাহিনি বলতে শুরু করলেন। সেই কাহিনির ভেতর থেকে প্রশ্ন বের করে আবার প্রশ্ন করেন। এভাবে আলোচনা এগোতে থাকে। সাক্ষাৎকার নেওয়া শেষে ছবি তোলার অনুমতি চাইলেন। তিনি কোনো আপত্তি তো করলেন না, বরং খুশি হয়ে বললেন, ‘এ লাইনে আমাদের দেশের মেয়েরা একেবারেই আসে না।’
ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে ছবি তুলতেই একটা ঘটনা ঘটে যায়। ফ্লাশের আলো ঝলকে উঠতেই অঘটন ভেবে ঘরের ভেতর ছুটে আসেন সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়। সাইদা খানমকে ছবি তুলতে দেখে তিনি হেসে ফেলেন। সত্যজিৎ তার স্ত্রীর সঙ্গে সাইদা খানমের পরিচয় করিয়ে দেন। কিছুক্ষণ আলাপেই সাইদা খানমের কাছে বিজয়া রায় হয়ে ওঠেন মঙ্কুদি। চা খাওয়ার পর সত্যজিতের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। বিজয়া রায় এলেন সিঁড়ি পর্যন্ত। বললেন, ‘এখন থেকে আর অ্যাপয়নমেন্ট করে আসার দরকার নাই। যখন কলকাতায় আসবে, সময় করে চলে আসবে।’ সেই থেকে সত্যজিতের বাড়ির দরজা সাইদা খানমের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।
সাইদা খানম সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’, ‘মহানগর’ ও ‘কাপুরুষ মহাপুরুষ’–এই তিনটি ছবির শুটিং দেখেন। চারুলতা শুটিংয়ের সময় বেশ কড়াকড়ি ছিল। সত্যজিৎ তখন শুটিং ফ্লোরে কোনো সাংবাদিককে ঢোকার অনুমতি দিতেন না। শুধু সাইদা খানম ও ব্রিটিশ এক চিত্রশিল্পীকে ফ্লোরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। সাইদা খানম সত্যজিৎকে ডাকতেন ‘মানিকদা’ বলে। আর সত্যজিৎ তাকে ডাকতেন ‘বাদল’ নামে। সত্যজিৎ এরপর সাইদা খানম কোনো ছবি তুলতে চাইলে কখনোই না করেননি। সাইদা খানম যখন যেভাবে চেয়েছেন, ছবি তুলতে দিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ তারা একজন তান্ত্রিক দেবী; বৌদ্ধ ধর্মে দেবী তারা
সত্যজিৎ যখন অস্কার জেতেন, তখন কলকাতায় তার সঙ্গে দেখা করতে যান সাইদা খানম। কলকাতা পৌঁছার পরদিন তিনি সত্যজিতের বাড়িতে যান। নিশ্চুপ বাড়ি। বিজয়া রায় সবে বেলভিউ নার্সিং হোম থেকে ফিরেছেন। ক্লান্ত, বিষণ্ন; নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছেন। দু-এক দিন পরপর সাইদা খানম তার মঙ্কুদির কাছে যেতেন। ক্লান্ত মঙ্কুদি যখন ঘুমিয়ে পড়তেন, তখন সাইদা খানম তার মানিকদার ঘরে গিয়ে একবার ঘুরে আসতেন। ঘরে ঢুকলেই তার মনে হতো, এখনই আসবেন মানিকদা। একদিন দেখলেন, জানালার ফাঁক গলে শূন্য সোফার উপর সূর্যের আলো এসে পড়ছে। ক্যামেরায় হাত দিতেই তার মনে হলো–’মানিকদা বলছেন, আর কত ছবি তুলবে, বাদল?’
সত্যজিতের অন্তিম সময়ে সাইদা খানম বিজয়া রায়কে বললেন, ‘আমি কী একবার মানিকদাকে দেখার সুযোগ পেতে পারি?’ বিজয়া রায় বললেন, ‘কাল সকালে তোমাকে নিয়ে যাব। তবে তোমাকে যদি চিনতে না পারে দুঃখ পেও না। কারণ, মানিক তার এক ঘনিষ্ট বন্ধুকেও চিনতে পারেনি।’ ইনটেনসিভ কেয়ারে কান্নাভরা মন নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের শয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন সাইদা খানম। বিজয়া রায় বললেন, ‘দেখো, বাদল এসেছে।’ সত্যজিৎ রায় বড় করুণ আর ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘কেমন আছো বাদল?’ সাইদা খানম তার মানিকদার হাতটা স্পর্শ করলেন। ঠান্ডা হাত।
সাইদা খানম (১৯৩৭ – ২০২০)
বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্র শিল্পী





