Tuesday, 21 April, 2026
21 April
HomeকলকাতাKolkata: কলকাতার ডার্ক আন্ডারওয়ার্ল্ড! ১১০০ কোটির আবাসন জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট রাজ

Kolkata: কলকাতার ডার্ক আন্ডারওয়ার্ল্ড! ১১০০ কোটির আবাসন জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট রাজ

ইতিহাস বলছে যে নির্বাচনের সময় দৌড় ঝাঁপ দেখতে পেলেও, নির্বাচন পেরিয়ে গেলেই আবার সব চুপচাপ হয়ে যায়।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

চন্দন দাস, কলকাতাঃ

আজকের এই প্রতিবেদনটি তোমাকে নিয়ে যাবে কলকাতার সেই অন্ধকার গলিপথে, যেখানে বিত্ত আর বৈভবের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর অপরাধের নকশা।

তুমি হয়তো ভাবছ, দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ বা ফার্ন রোডের মতো অতি-অভিজাত এলাকায় দিনের আলোয় এমন কী ঘটতে পারে যা পুরো রাজ্যকে নাড়িয়ে দিতে পারে?

কিন্তু গত ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬-এর সেই কালচে ভোরে যখন শহরের অধিকাংশ মানুষ ঠিকমতো ঘুম থেকেও ওঠেনি, তখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র আধিকারিকরা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সাথে নিয়ে একযোগে হানা দেন শহরের একাধিক জায়গায়।

এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল একজন দাপুটে পুলিশ অফিসার এবং একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। এই তল্লাশির পর থেকেই সামনে আসতে শুরু করেছে এমন এক অপরাধের চক্র, যার ব্যাপ্তি শুনলে তুমি চমকে যাবে।

ইডি সূত্রে জানা গেছে, এই পুরো দুর্নীতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১১০০ কোটি টাকা কী তারও বেশি হতে পারে। আর এই পুরো চক্রের মূলে রয়েছে এমন কিছু নাম, যারা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কলকাতার রিয়েল এস্টেট এবং তোলাবাজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই দুর্নীতির জাল কতটা গভীরে বিস্তৃত, তা বোঝার জন্য আমাদের একটু পিছন ফিরে তাকাতে হবে এবং চিনতে হবে এই নাটকের প্রধান কুশীলবদের।

এই চক্রের সবচেয়ে কুখ্যাত এবং ভয়াবহ চরিত্র হলো বিশ্বজিৎ পোদ্দার, যাকে অপরাধের দুনিয়া ‘সোনা পাপ্পু’ নামে চেনে। তুমি শুনলে অবাক হবে যে, এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই খুন, খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা এবং অস্ত্র আইনের মতো প্রায় ১৫ টিরও বেশি গুরুতর অপরাধের মামলা ঝুলছে।

অথচ প্রশাসনের নাকের ডগায় সে নিজের সাম্রাজ্য চালিয়ে গিয়েছে অবলীলায়। সোনা পাপ্পু মূলত দক্ষিণ কলকাতার কসবা, বালিগঞ্জ এবং গড়িয়াহাট এলাকায় তার ‘সিন্ডিকেট’ রাজ কায়েম করেছিল। ইডি-র তদন্তে উঠে এসেছে যে, সোনা পাপ্পুর প্রধান কাজ ছিল কলকাতার বিতর্কিত বা ঝামেলার জমিগুলোকে চিহ্নিত করা।

এরপর পেশিশক্তি ব্যবহার করে সেই জমির মালিকদের ভয় দেখানো হতো অথবা জাল নথিপত্র তৈরি করে সেই জমির দখল নেওয়া হতো। প্রোমোটিং বা আবাসন নির্মাণের ক্ষেত্রে সে ‘সিন্ডিকেট ট্যাক্স’ বা তোলা আদায় করত। যদি কোনো বিল্ডার তার কথামতো টাকা দিতে অস্বীকার করত, তবে নেমে আসত ভয়াবহ শারীরিক হামলা।

আরও পড়ুনঃ টাকা বিলির অভিযোগ, গ্রেফতার তৃণমূল নেতা

এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই কাঁকুলিয়া রোডে হওয়া সেই হিংসাত্মক ঘটনার কথা তোমার মনে থাকতে পারে, যেখানে প্রায় ১০০ জন যুবক স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য। ইডি-র দাবি, সেই হামলার নেপথ্যেও ছিল এই সোনা পাপ্পু। গত ১ লা এপ্রিল তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে নগদ দেড় কোটিরও বেশি টাকা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি অত্যাধুনিক রিভলভার উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই সে বেপাত্তা।

কিন্তু সোনা পাপ্পুর মতো একজন দাগি অপরাধীর পক্ষে কি একা এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব ছিল? এখানেই উঠে আসছে এক গভীর প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক যোগসাজশের কথা।

এই মামলার অন্যতম চাঞ্চল্যকর দিক হলো কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের নাম জড়িয়ে পড়া।

১৯ শে এপ্রিল যখন ইডি আধিকারিকরা বালিগঞ্জে শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বাড়িতে পৌঁছান, তখন তাঁদের প্রায় ৯০ মিনিট দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তুমি ভাবো, একজন আইপিএস পদমর্যাদার অফিসারের বাড়িতে কেন ইডি হানা দিচ্ছে?

তদন্তকারীদের দাবি, সোনা পাপ্পুর তোলাবাজি এবং জমি দখলের সিন্ডিকেটকে পর্দার আড়াল থেকে আইনি সুরক্ষা জোগাতেন এই উচ্চপদস্থ অফিসার। ইডি-র হাতে আসা একটি গোপন ডায়েরিতে ‘শান্তনু স্যার’ নামে একাধিক এন্ট্রি পাওয়া গেছে, যার পাশে মোটা অঙ্কের নগদ লেনদেনের হিসেব রয়েছে। এই সুরক্ষা কবজ ছাড়া সোনা পাপ্পু দক্ষিণ কলকাতায় দিনের আলোয় এভাবে জমি জবরদখল করতে পারত না। পুলিশের একাংশের এই মদত এই সিন্ডিকেটকে এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছিল।

তবে শুধুমাত্র পেশিশক্তি আর পুলিশি সুরক্ষা দিয়ে তো আর ১১০০ কোটি টাকার দুর্নীতি সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন ছিল একজন আর্থিক জাদুকর বা ‘মানি লন্ডার’।

এই চক্রের সেই মাস্টারমাইন্ড হলো জয় কামদার। জয় কামদার হলেন ‘সান এন্টারপ্রাইজ’ নামক একটি সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং বেহালার এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। ১৯ শে এপ্রিল দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর জয় কামদারকে গ্রেফতার করে ইডি। তদন্তে উঠে এসেছে যে, জয় কামদার ছিলেন এই পুরো সিন্ডিকেটের আর্থিক মস্তিষ্ক।

সোনা পাপ্পু যে টাকা তোলাবাজি বা জমি দখল করে আদায় করত, সেই বিপুল পরিমাণ ‘কালো টাকা’ জয় কামদারের মাধ্যমেই সাদা করা হতো। তিনি মূলত একটি বিশাল ‘শেল কোম্পানি’ বা ভুয়ো সংস্থার নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। ইডি আদালতকে জানিয়েছে যে, জয় কামদার মাত্র চার মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা নগদ জমা করেছিলেন।

হ্যাঁ ঠিকই শুনেছ ৫০০ কোটি টাকা

এই টাকাগুলো বিভিন্ন হাত ঘুরে বিদেশের একাধিক দেশে যেমন দুবাই, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাজ্যে (ইউকে) ‘হাওয়ালা’র মাধ্যমে পাচার করা হতো। তুমি চিন্তা করে দেখো, কলকাতার বুক থেকে তোলাবাজি করা টাকা কীভাবে আন্তর্জাতিক স্তরে পাচার হয়ে যাচ্ছিল খুব পরিকল্পনা মাফিক।

জয় কামদারের প্রভাব শুধু সাধারণ ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, কলকাতার বড় বড় সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তহবিলের ওপরেও তাঁর আধিপত্য ছিল।

ইডি-র অভিযোগ, জয় কামদার ক্যালকাটা গুজরাটি এডুকেশন সোসাইটি (CGES) নামক একটি অত্যন্ত সম্মানীয় প্রতিষ্ঠানের তহবিলের প্রায় ৪০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই টাকা তিনি নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য এবং সিন্ডিকেটের জমি দখলের কাজে চিকাস এন্টারপ্রাইজ (Chicas Enterprise) নামক একটি ভুয়ো সংস্থার মাধ্যমে ব্যবহার করেছেন।

এই জালিয়াতিটি ধরা পড়ার পর থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, কীভাবে জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের অর্থকেও এই চক্রটি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করত। জয় কামদার তাঁর এই প্রভাবশালী পরিচিতিকে ব্যবহার করে একদিকে যেমন সমাজে নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে তিনি ছিলেন সোনা পাপ্পুর মতো অপরাধীদের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা।

তুমি যখন এই ১১০০ কোটির দুর্নীতির অন্দরমহলে উঁকি দেবে, তখন দেখবে এটি শুধুমাত্র একটি তোলাবাজির মামলা নয়, বরং এটি আধুনিক যুগের এক অত্যন্ত জটিল আর্থিক জালিয়াতি। জয় কামদারকে গ্রেফতার করার পর ইডি-র হাতে আসা ডিজিটাল প্রমাণগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কলকাতার রিয়েল এস্টেট বাজারকে কীভাবে এক অদৃশ্য সুতোয় নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল।

তুমি কি জানো, জয় কামদারের মাধ্যমে শুধু নগদ টাকা জমা দেওয়াই হতো না, বরং বিভিন্ন ‘ডেড’ বা অকেজো কোম্পানিকে পুনরুজ্জীবিত করে সেগুলোকে টাকা সাদা করার কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হতো? তদন্তে দেখা গেছে, জয় কামদার এবং তাঁর সহযোগীরা দক্ষিণ কলকাতার এমন সব জমি টার্গেট করত যেগুলোর মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা আছে অথবা যেগুলোর মালিক বৃদ্ধ বা দীর্ঘকাল ধরে দেশের বাইরে থাকেন।

সোনা পাপ্পুর বাহিনী সেই জমিগুলোতে রাতের অন্ধকারে পাঁচিল তুলে দিত এবং পরের দিনই সেই জমির ভুয়ো কাগজ বা ‘পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি’ তৈরি করে জয় কামদারের কোনো না কোনো ডামি সংস্থার নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হতো। এরপর সেই জমি চড়া দামে কোনো নামী বিল্ডারকে বিক্রি করে দেওয়া হতো। যদি কোনো বিল্ডার এই চোরাই জমি কিনতে না চাইতেন, তবে সোনা পাপ্পুর ‘সিন্ডিকেট’ সেই প্রজেক্টের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিত। এই পদ্ধতিতে অর্জিত কয়েকশো কোটি টাকা জয় কামদারের ‘সুপ্রিম ক্রেডিট কর্পোরেশন লিমিটেড’-এর মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে মূল ধারার অর্থনীতিতে মিশিয়ে দেওয়া হতো।

আরও পড়ুনঃ ভোটের মুখেই কেন্দ্রীয় সংস্থাদের হাইভোল্টেজ বৈঠক! বিপদের গন্ধ পাচ্ছে তৃণমূল

এই বিশাল আর্থিক কারচুপির জাল শুধু কলকাতার অলিগলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছড়িয়ে পড়েছিল আন্তর্জাতিক সীমানা ছাড়িয়ে। ইডি-র হাতে আসা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট এবং ফরেনসিক রিপোর্ট থেকে জানা গেছে যে, জয় কামদার আন্তর্জাতিক স্তরে এক বিশাল হাওয়ালা নেটওয়ার্কের প্রধান এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন।

তুমি শুনলে অবাক হবে যে, দুবাই এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশে এই সিন্ডিকেটের একাধিক স্থাবর সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলে তদন্তকারীরা জোরালো সন্দেহ করছেন। এমনকি এই চক্রের টাকা ব্রিটেনের (UK) কিছু নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে ‘ইনভেস্টমেন্ট’ হিসেবে পাচার করা হয়েছে। এই পুরো অপারেশনটি চালানোর জন্য জয় কামদার ব্যবহার করতেন একঝাঁক পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ফিন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্টদের, যারা খুব সূক্ষ্মভাবে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে এই টাকা পাচার করার রাস্তা তৈরি করে দিতেন।

ইডি-র দাবি, এই ১১০০ কোটির মধ্যে প্রায় অর্ধেক টাকাই দুবাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে আবার ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, কলকাতার সাধারণ মানুষের থেকে তোলাবাজি করে নেওয়া টাকা বিদেশ ঘুরে আবার বৈধ বিনিয়োগ হিসেবে দেশের বাজারে ঢুকেছে। এই ধরণের ‘রাউন্ড ট্রিপিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করার ফলে সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার পক্ষে এই জালিয়াতি ধরা প্রায় অসম্ভব ছিল।

কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে রহস্যময় এবং ভয়ংকর চরিত্র হলো সোনা পাপ্পুর স্ত্রী সোমা সোনার পোদ্দার। তুমি ভাবতে পারো, একজন অপরাধীর স্ত্রীর ভূমিকা এখানে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?

ইডি-র তদন্ত বলছে, সোমা সোনার পোদ্দার শুধুমাত্র একজন গৃহবধূ নন, বরং এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সক্রিয় অংশীদার। জয় কামদার সরাসরি সোমা সোনার পোদ্দারের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এবং তাঁর মালিকানাধীন সংস্থা ‘এসপি কনস্ট্রাকশন’-এ বিপুল পরিমাণ টাকা পাঠিয়েছেন।

শুধু টাকা নয়, ১৯ শে এপ্রিলের তল্লাশিতে উঠে এসেছে আরও এক বিস্ফোরক তথ্য—জয় কামদার নাকি সোমা সোনার পোদ্দারকে বেআইনি অস্ত্রও সরবরাহ করতেন। ইডি-র জেরায় সোমা এই অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।

এই অস্ত্রের যোগসূত্র প্রমাণ করে যে, এই চক্রটি শুধুমাত্র কলম বা জাল নথিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রয়োজনে তারা যে কোনো ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্যও প্রস্তুত থাকত। সোনা পাপ্পু যখন সামনে থেকে লড়াই করত, তখন পর্দার আড়াল থেকে এই পুরো লেজার বুক এবং অস্ত্রের জোগান নিয়ন্ত্রণ করতেন জয় কামদার ও সোমা।

এই ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে সোনা পাপ্পু নিজের জন্য বিলাসিতার সব আয়োজন করে রেখেছিল, যার প্রমাণ হিসেবে তার বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ফরচুনার গাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ সোনার গয়না তোমার নজর কাড়বে।

এই আর্থিক তছরুপের একটি বড় অংশ খরচ করা হতো প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের খুশি রাখতে। ইডি আধিকারিকরা যখন ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বাড়িতে তল্লাশি চালান, তখন তাঁরা কিছু এমন নথিপত্র পান যা পুলিশের শীর্ষ মহলের সাথে এই সিন্ডিকেটের সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করে।

তদন্তকারীদের প্রশ্ন হলো, সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে এতগুলো এফআইআর থাকা সত্ত্বেও পুলিশ কেন এতদিন তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি? কেনই বা তার বাড়ির সামনে থেকে কোনো বাধা ছাড়াই সে দিনের পর দিন তোলাবাজি চালিয়ে গেল?

ইডি-র ধারণা, পুলিশের একটা বড় অংশকে মাসিক বা প্রজেক্ট ভিত্তিক মোটা অঙ্কের মাসোহারা দেওয়া হতো। শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সেখানে সোনা পাপ্পু বা জয় কামদারের ঘনিষ্ঠদের থেকে কোনো টাকা সরাসরি বা ঘুরপথে ঢুকেছে কি না, তা বের করাই এখন তদন্তকারীদের মূল চ্যালেঞ্জ। পুলিশের এই একাংশের নিষ্ক্রিয়তাই এই সিন্ডিকেটকে এতটাই শক্তিশালী করে তুলেছিল যে, তারা কলকাতার মতো মেট্রো সিটির আইন-শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করেই সমান্তরাল এক শাসন ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছিল।

আরেকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই চক্রের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডের যোগসূত্র। একটু আগেই বললাম যে, ক্যালকাটা গুজরাটি এডুকেশন সোসাইটির (CGES) তহবিলের ওপর জয় কামদারের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। জয় কামদার এই সোসাইটির ক্ষমতার অলিন্দে থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

ইডি খতিয়ে দেখছে, এই টাকা দিয়ে কি কোনো রাজনৈতিক নেতার নির্বাচন বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি কেনা হয়েছে? বিশেষ করে রাসবিহারী এলাকার প্রভাবশালী নেতৃত্বের নাম এখানে বারবার উঠে আসছে। আয়কর দপ্তর তদন্ত করে দেখছে যে, সেই সব ব্যক্তিদের নির্বাচনী হলফনামায় দেওয়া সম্পত্তির হিসেবের সাথে এই সিন্ডিকেটের আর্থিক লেনদেনের কোনো মিল আছে কি না। বিধায়কের পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তি এবং বিভিন্ন ট্রাস্টি পদে তাঁদের ভূমিকা এখন বিশদ তদন্তের দাবি রাখে। এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়াই ছিল এই ১১০০ কোটির দুর্নীতির আসল চালিকাশক্তি, যা দক্ষিণ কলকাতার রিয়েল এস্টেট বাজারকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল।

আমাদের তাকাতে হবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির দিকে, যা এই ১১০০ কোটির মেগা স্ক্যামকে এক অনন্য মাত্রা দান করেছে। তুমি যখন এই খবরগুলো পড়বে, তখন মনে রাখবে যে ২০২৬-এর এই উত্তপ্ত নির্বাচনী আবহেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো তাদের সবচেয়ে বড় চালে পা বাড়িয়েছে।

গত ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬-এর সকালটি রাসবিহারীর বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমারের জন্য ছিল অত্যন্ত অস্বস্তিকর। আয়কর দপ্তরের একটি বিশাল দল যখন তাঁর মনোহরপুকুর রোডের বাসভবন এবং নির্বাচনী কার্যালয়ে হানা দেয়, তখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে সোনা পাপ্পু এবং জয় কামদারের এই সিন্ডিকেটের জাল রাজনীতির কতটা গভীরে প্রোথিত।

প্রায় ১৬ ঘণ্টা ধরে চলা সেই ম্যারাথন তল্লাশিতে বিধায়কের অফিস থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার করেছেন তদন্তকারীরা। ইডি-র একটি সূত্র বলছে, সোনা পাপ্পুর ডায়েরিতে পাওয়া ‘পেমেন্ট’ সংক্রান্ত তথ্যের সাথে বিধায়কের নির্বাচনী ফান্ডের কোনো সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, সেটাই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে উল্লেখ করলেও, ১১০০ কোটির এই কেলেঙ্কারির নথিপত্র কিন্তু এক ভিন্ন সত্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বিষয়টি এখানে আরও একটু খোলসা করা দরকার। তুমি হয়তো ভাবছ একজন সাধারণ পুলিশ অফিসার কীভাবে এত বড় সিন্ডিকেটকে আড়াল করছিলেন, কিন্তু এখানে টুইস্ট হলো—শান্তনু বাবু কিন্তু বর্তমানে চাকরিতে থাকা কোনো অফিসার নন, তিনি আসলে একজন অবসরপ্রাপ্ত (Retired) পুলিশ কর্তা। তবে অবসর নিলেও ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর প্রভাব ছিল অটুট, কারণ রাজ্য সরকার তাঁকে পুনর্নিয়োগ করে ‘পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতা পুলিশ কল্যাণ কমিটি’-র প্রধান সমন্বয়কারী বা নোডাল অফিসারের মতো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী পদে বসিয়েছিল। ইডি-র ধারণা, এই বিশেষ পদের চেয়ারে বসেই তিনি পর্দার আড়াল থেকে সোনা পাপ্পুর বাহিনীকে আইনি সুরক্ষা জোগাতেন।

এই মামলার সবচেয়ে বিস্ফোরক দিক হলো জয় কামদারের মাধ্যমে হওয়া আন্তর্জাতিক হাওয়ালা লেনদেন। ইডি ২০শে এপ্রিল আদালতে পেশ করা প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, জয় কামদার শুধুমাত্র কলকাতার একজন প্রোমোটার ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই সিন্ডিকেটের ‘গ্লোবাল ট্রেজারার’।

বর্তমান আইনি পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০শে এপ্রিল ২০২৬-এ কলকাতার বিশেষ পিএমএলএ আদালত জয় কামদারকে ৯ দিনের ইডি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এই ৯ দিন জয় কামদারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে চলেছে কারণ তাঁকে মুখোমুখি বসানো হতে পারে সোনা পাপ্পুর স্ত্রী সোমা সোনার পোদ্দার এবং ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বাজেয়াপ্ত করা নথিপত্রের সাথে। পুলিশ মহলের সাথে জয় কামদারের ‘বিশেষ সখ্যতা’ এখন লালবাজারের জন্য বড় লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইডি নিশ্চিত করেছে যে, জয় কামদার প্রশাসনের একাংশকে দামী উপহার এবং সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যে জমি সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করতেও তিনি পুলিশের এই প্রভাবকে ব্যবহার করতেন। পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের ভূমিকা এখন এই তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া নথিপত্র যদি জয় কামদারের বয়ানের সাথে মিলে যায়, তবে তা কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে এক বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হবে।

সব শেষে বলা যায়, এই ১১০০ কোটির দুর্নীতি শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তির অর্থলিপ্সার (টাকার প্রতি অত্যধিক লোভ) গল্প নয়, এটি হলো সিস্টেমের ভেতর থাকা সেই ঘুণপোকাদের গল্প যারা সাধারণ মানুষের তিল তিল করে জমানো সম্পত্তির ওপর থাবা বসায়।

সোনা পাপ্পু এখনও ফেরার থাকলেও, তাঁর সাম্রাজ্যের প্রতিটি স্তম্ভ এখন নড়বড়ে। জয় কামদারের গ্রেফতারি এবং দেবাশিস কুমারের ওপর তদন্তকারী সংস্থাগুলোর চাপ প্রমাণ করে যে, এবারের লড়াইটা অনেক বেশি গভীর।

তুমি যখন তোমার এলাকার কোনো নির্মাণ কাজ দেখবে, তখন হয়তো এই সিন্ডিকেটের কথা তোমার মনে পড়বে। কিন্তু মনে রেখো, তদন্তের এই গতি যদি বজায় থাকে, তবে হয়তো আর কোনোদিন সোনা পাপ্পু বা জয় কামদারের মতো কেউ কলকাতার জমিকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করার সাহস পাবে না।

কিন্তু ইতিহাস বলছে যে নির্বাচনের সময় দৌড় ঝাঁপ দেখতে পেলেও, নির্বাচন পেরিয়ে গেলেই আবার সব চুপচাপ হয়ে যায়।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন