বঙ্গভূমি আদিশক্তির বাসস্থান, শক্তি পূজার বৈচিত্র্য বাংলায় প্রচুর। একটা সময় পর্যন্ত আমি জানতাম দুর্গাপূজা বাংলায় কেবল দুইবার হয় একটি বছরে, কিন্তু বাংলার উৎসব বৈচিত্র্য নিয়ে যত পড়তে লাগলাম, আমার ধারণাই পাল্টে গেল। মায়ের কালী রূপের পূজা বাংলায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে হয়, কিন্তু শুনলে অবাক লাগবে বাংলায় অকাল দুর্গাপূজা তাও সপরিবারের দুর্গাপূজার সংখ্যাটাও সারা বছরে কম নয়!
চলছে ফাল্গুন মাস, দেখতে দেখতে পরের মাসেই বাসন্তী পূজার তোড়জোড় শুরু হবে। কিন্তু এই ফাল্গুন মাসেও মা সপরিবারে আসবেন, আবার মায়ের সঙ্গে বাবার ঘটা করে বিয়ে হবে- শুনতে অবাক লাগছে? অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমাদের চলে যেতে হবে রানাঘাট।
আরও পড়ুনঃ “I Am A Disco Dancer”; দাদুর মরদেহ শ্মশানঘাটে নিয়ে যাওয়ার সময় উদ্দাম নৃত্যে সামিল নাতি-নাতনিরা
এই ফাল্গুনের শুক্লা ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত সেখানে বসেছে দুর্গাপূজার আসর, একদম সপরিবারে! আছে গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিক। সাথে আছে বাবা মহেশ্বর অনুচরদের সাথে। আবার ঐদিকে ব্রহ্মাও আছেন!
রানাঘাট বড়বাজার এলাকার এই মহিষমর্দিনী পূজা বাংলার অকাল দুর্গাপূজা গুলোর মধ্যে অন্যতম।
পুজোর ইতিহাস শুনতে গেলে বলতেই হয় এ পুজোর একটা ৩০০-৩৫০ বছরের ইতিহাস আছে। তৎকালীন জমিদারদের দ্বারা পরিচালিত এই পুজো মাঝে বন্ধ হয়ে যায়, যার জন্য প্রতিমার কাঠামো ভাসিয়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য ঐ কাঠামো ভাসতে ভাসতে চলে আসে কালনায়, স্বপ্নাদেশ অনুসারে সেখানে এক ব্যবসায়ী ঈশ্বরচাঁদ পাল চৌধুরী চৈত্রে প্রাথমিক ভাবে শুরু করেন এই বিখ্যাত মহিষমর্দিনী পুজো। পরবর্তীতে শ্রাবণে চলে আসে এই পুজোর সময়।
বর্তমানে রানাঘাটে পুজো পুনরায় চালু হয়েছে, অনেক বছর পুজো হচ্ছে। পুজো হয় চারদিন ধরে। অষ্টমীর দিন অর্থাৎ বাবা-মায়ের বিয়ের আগেরদিন হবে জল সাজা ও চূর্ণী নদীতে ১০০০ প্রদীপ প্রজ্বলন । এবছর আজকে অষ্টমী তিথি।
আগামীকাল নবমী। এবার একজন নারদ মুনি সাজবেন, বাবার মূর্তি সঙ্গে নিয়ে গোটা শহরে ঘোরা হবে বিবাহের আমন্ত্রণ জানাতে। বাবা সাজবেন বিয়ের বেশে , মাথায় পরবেন টোপর!
এবার ঘুরে এসে মণ্ডপে ঢুকবেন, বাবার হবে বিশেষ বরণ। আরতির পর শুরু হবে বিয়ের অনুষ্ঠান। সাধারণ বিয়েতে যা যা হয় যেমন মালাবদল, সিঁদুর পরানো ইত্যাদি সবই হবে।
বিবাহ হবে আর লোক খাওয়ানো হবেনা? অবশ্যই হবে। বহু লোকের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে এই নবমীতে।
এখন বিয়ে হয়েছে, ঘরের মেয়েকে তো পরদিন ছাড়তেই হবে, তার ওপর আবার দশমী। সবাই মিলে মাকে বরণ করে আবার আসার অপেক্ষায় আমরা বিদায় দেবো মা কে। মা-ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান পরের ফাল্গুনে আবার আসবেন।
যেকোনো পুজো মানুষের মিলনক্ষেত্র, সাথে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে উন্নতির সম্ভাবনা রাখে। আর এই সুন্দর হালকা ঠাণ্ডা-হালকা গরমে দুর্গাপূজার অনুভূতি অন্যরকমই! এই যে বছরের বিভিন্ন সময়ে মায়ের বিভিন্ন ভাবে আগমন, এ বড় আনন্দের। ঠিক ঘরের মেয়েরা বিয়ের পরে যতবার বাপের বাড়ি আসুক না কেন, ঘর আনন্দেই ভরে ওঠে। আর আমাদের সংস্কৃতি দিয়ে আমরা দেবতাদের যে মানবায়ন করেছি, এর থেকে মধুর কিছু নেই। বাংলাতেই কত সুন্দর করে এই দেবদেবীদের ঘরের মানুষ করে নেওয়া যায়! আহা! কত সহজেই নিজের আরাধ্যকে মা-বাবা বানিয়ে ফেলা যায়! আমার বহু জন্মের তপস্যা আমি বঙ্গভূমিতে জন্মেছি, আরো বহুবার এই বাংলার মাটিতেই ফিরে আসতে চাই! নাহলে এতসুন্দর জিনিস থেকে আমি যে বঞ্চিত হয়ে যাবো!
যে মাটি আমাদের আরাধ্যকে করেছে আমাদের ঘরের মানুষ, সে মাটির ঋণ শোধ হবেনা কোনোদিন।









