রাজ্যে এবার আলুর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা। আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূল থাকায় অন্যান্য রাজ্যের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও আলুর উৎপাদন গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছে রাজ্য সরকার। এই পরিস্থিতিতে বাজারে জোগান বাড়লে আলুর দাম হুড়মুড়িয়ে কমে যাওয়ার একটা প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দাম কমে গেলে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক আলু চাষি অভাবী বিক্রির মুখে পড়ে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। মূলত চাষিদের সেই বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতেই এবার বড়সড় পদক্ষেপ করল রাজ্য মন্ত্রিসভা। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সরকারি উদ্যোগে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে আলু কেনার সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিল নবান্ন।
আরও পড়ুনঃ পাকিস্তানের মার্কিন যুদ্ধবিমান F-16 ধ্বংস আফগান হামলায়! দাবি কাবুলের
বৃহস্পতিবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর একটি সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর কৃষি উপদেষ্টা প্রদীপ মজুমদার এই সিদ্ধান্তের কথা বিস্তারিতভাবে জানান। তিনি বলেন, “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে কৃষকদের অভাবী বিক্রি রোধ করতে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমাদের রাজ্যে ধানের পরেই আলু হল দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফসল। কৃষকরা যাতে কোনওভাবেই ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত না হন, তার জন্যই এই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।” মন্ত্রী জানান, আগামী মার্চ মাসের শুরু থেকেই রাজ্যে নতুন জ্যোতি আলু ওঠা শুরু হবে। সেই সময় থেকেই কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি গুণগত মান যাচাই করে আলু কেনা শুরু করবে সরকার।
কত টাকায় এবং কী নিয়মে আলু কিনবে সরকার? এই প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার জানিয়েছেন, কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘরের গেটেই কৃষকদের কাছ থেকে কেজি প্রতি 9 টাকা 50 পয়সা দরে আলু কেনা হবে। উল্লেখ্য, গত বছর এই সহায়ক মূল্য ছিল কেজি প্রতি 9 টাকা, এবার তা 50 পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে একজন কৃষক চাইলেই সীমাহীন পরিমাণ আলু সরকারকে বিক্রি করতে পারবেন না। প্রান্তিক চাষিদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে এক্ষেত্রে একটি ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, একজন কৃষক সর্বাধিক 35 কুইন্টাল বা 70 ব্যাগ আলু (প্রতিটি ব্যাগে 50 কেজি করে) সরকারকে এই দামে বিক্রি করতে পারবেন।
রাজ্য সরকারের কৃষি বিপণন দফতরের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয়েছিল এবং তাতে মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত অনুমোদন দিয়েছেন। সরকার কৃষকদের কাছ থেকে আলু কিনে তা নিজস্ব ব্যবস্থায় হিমঘরে সংরক্ষণ করবে। এরপর আগামী জুন মাসের পর থেকে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ধাপে ধাপে সেই আলু খোলা বাজারে ছাড়া হবে। সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রী জানান, আপাতত রাজ্য সরকারের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে 12 লক্ষ টন আলু সংগ্রহ করার। বড় বা বিত্তবান চাষিদের থেকে নয়, বরং রাজ্যের প্রান্তিক কৃষকরা যাতে ফসলের সঠিক দাম পান এবং অসহায় বোধ না করেন, সেটাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
আরও পড়ুনঃ বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত! রেকর্ড হারে দেশ ছাড়ছেন ট্রাম্পের দেশের নাগরিকরা
অতীতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী এদিন আরও জানান, গত 14 বছরে মোট ছয় বার রাজ্য সরকার কৃষকদের স্বার্থে সরাসরি আলু কিনেছে। এর আগে 2020 সালে অতিমারির সময় যখন আলুর ফলন কম থাকায় দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল, তখন বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার 31 হাজার টন আলু কিনেছিল।
এবারের ফলন এতটা ভালো হওয়ার পেছনের কারণও এদিন ব্যাখ্যা করেছেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। তিনি জানান, আলুর সবথেকে বড় শত্রু হল ‘ব্লাইট’ (Blight) বা ধসা রোগ। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে বা বৃষ্টির পর কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া তৈরি হলে এই রোগের জীবাণু খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জমির সব আলু নষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে হুগলি জেলার মতো আলু উৎপাদনকারী এলাকায় এই ধসা রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। কিন্তু, চলতি শীতের মরশুমে বৃষ্টি বা কুয়াশা প্রায় ছিলই না। এমন আদর্শ ও শুষ্ক আবহাওয়া আলুর ফলনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এর ফলেই ফলন এবার রেকর্ড ছুঁতে পারে।
অন্যদিকে, ভিন রাজ্যে ইতিমধ্যেই আলুর দাম কমতে শুরু করেছে। সেই প্রভাব যাতে বাংলার কৃষকদের ওপর না পড়ে, তার জন্যই আগাম সতর্কতা হিসেবে এই ঘোষণা। প্রদীপ মজুমদার জানান, সরকার যখনই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে আলু কেনা শুরু করে, তখন ব্যবসায়ীরাও বাধ্য হয়ে কৃষকদের থেকে আরও বেশি দামে আলু কেনেন। ফলে আখেরে লাভবান হন কৃষকেরাই। এছাড়া ভিন রাজ্যে আলু পাঠানোর ক্ষেত্রেও সরকারের তরফ থেকে কোনও রকম নিষেধাজ্ঞা নেই বলে এদিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন মন্ত্রী।









