তিহাড় জেল থেকে ফেরার পর রাজনীতি থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে রেখেছিলেন বীরভূমের দাপুটে নেতা অনুব্রত মণ্ডল। কিন্তু সম্প্রতি এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে তিনি নীরবতা ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দলের অন্দরের অস্থিরতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন। স্পষ্ট ভাষায় জানালেন, সম্মান না পেলে আর দলের সঙ্গে থাকবেন না তিনি। একই সঙ্গে ছাব্বিশের নির্বাচনে দলের ভরাডুবি জন্য তিনি দায়ী করলেন আইপ্যাককে। তাঁর অভিযোগ, ব্লক থেকে জেলা স্তর পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সংস্থাটি আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছিল, যা দলের ভাবমূর্তিকে চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সম্প্রতি লোকসভা এবং বিধানসভায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পৃথক ব্লক গড়ার চেষ্টাতেও ভুল কিছু দেখছেন না অনুব্রত মণ্ডল।
আরও পড়ুনঃ ‘কল্যাণদা মানুষ করেছেন’, অ্যারোগেন্ট ইমেজ ঝেড়ে বিনয়ের বার্তা, নতুন সুর অভিষেকের
গরুপাচার মামলায় অনুব্রত মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। তিহাড় থেকে ফেরার পর রাজনীতিতে তাঁকে আর সে ভাবে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। বীরভূমে অনুব্রতের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসাবে তৃণমূলের অন্দরেই মাথা তুলেছিল আর এক নাম- কাজল শেখ। তাঁকে হাসন থেকে এবার টিকিটও দিয়েছিল দল। পরিবর্তনের হাওয়াতেও তিনি জিতেছেন। তবে ভোটের প্রচারে অনুব্রতকে সে ভাবে দেখা যায়নি। তৃণমূলের সাম্প্রতিক ব্যর্থতার জন্য সরাসরি ‘আইপ্যাক’-কে কাঠগড়ায় তুলেছেন অনুব্রত মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘১৯৯৮ সালে দল তৈরি হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী ছিলেন। আমরা সাতটি আসন জিতেছিলাম। তখন কোনও জ্ঞানীমুনি ছিল না। আমাদের মতো রাখাল-বাগালরাই দলকে টেনেছে। আইপ্যাককে তখন দরকার হয়নি। পরে তাদের প্রয়োজন পড়ল কেন? ওদের জন্যই দলের এই ভরাডুবি। দুনিয়ার লোকের কাছ থেকে ওরা টাকা তুলেছে। রাজনীতির কিছু জানে না। ওরা পয়সা কামাতেই এসেছিল।’ কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল। সেই কংগ্রেসকে চটানো ভুল হয়েছে বলে মনে করেন অনুব্রত। তাঁর আক্ষেপ, ‘কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে আমরা ক্ষমতায় এলাম। কংগ্রেসকে চটানোটা আমাদের ভুল হয়েছে। কিন্তু কে কার কথা শোনে! আইপ্যাক এত টাকা তুলল। কিন্তু কেউ যদি জেগে ঘুমায়, দলের তো এই অবস্থা হবেই।’
আরও পড়ুনঃ অভিষেক পারলেন না ‘DJ’ বাজাতে, কানাডা কাঁপালেন ‘বাংলাদেশি’ DJ
অনুব্রত মণ্ডলের আরও অভিযোগ নির্বাচনে তাঁকে বিশেষ কোনও দায়িত্ব দেয়নি দল। বীরভূমের নেতার কথায়, ‘জেলায় তৃণমূলের কোর কমিটির বৈঠকেও বিধানসভা নির্বাচনের ভোট পরিচালনার আমাকে আগের মত কোনও দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছি বিধায়করা ডাকলে যাবেন। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, দলে আমার ভূমিকা কী? বলা হয়, কোনও বিধায়ক ডাকলে আপনি যাবেন না। তা হলে আগ বাড়িয়ে আমার যাওয়ার দরকার কী? আমি তাই কিছু করিনি। বিজেপি খেটেছে, তাই জিতেছে।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাকীত্ব নিয়ে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন অনুব্রত। তিনি বলেন, ‘দিদিকে আমরা সকলেই খুব ভালোবাসতাম। কিন্তু শেষ দিকে উনি কার পাল্লায় পড়লেন, বুঝতে পারছি না।’ দলের অভ্যন্তরে যে বিদ্রোহ দানা বেঁধেছে, তা নিয়েও তিনি অকপট। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৫৯ জন বিধায়কের আলাদা ব্লক গঠনের চেষ্টাকে তিনি ‘ভুল’ বলতে নারাজ। তাঁর কথায়, ‘ভুল তো করছেন না। বিজেপিতে তো যাচ্ছেন না। আলাদা ফ্রন্ট করছেন। সকলে যে দিকে যাবেন, সে দিকেই তো যেতে হবে।’ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুব্রত মণ্ডল কিছুটা ধোঁয়াশা রাখলেও, তাঁর ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, ‘সম্মান পেলে আমি দল করব। না পেলে চুপচাপ থাকব। অন্য দলে যাব না। বিজেপিতে যাওয়ার কথা এখনও ভাবিনি। জেল থেকে ফেরার পর থেকেই আমি রাজনীতি করা বন্ধ করে দিয়েছি। ওরা অন্য জনের হাতে ঘি খেয়েছে। আমার হাতে খায়নি।’ রাজনীতি থেকে আপাতত দূরে থাকলেও অনুব্রত মণ্ডলের এই মন্তব্য যে তৃণমূলের অন্দরে নতুন করে অস্বস্তি বাড়াল, তাতে সন্দেহ নেই।


