কালনা:
বসন্তে বাসন্তী পুজো আর শরতে অকালবোধন—এই দুই ঋতুতেই দুর্গাপুজোর ধুম দেখতে অভ্যস্ত বাংলা। কিন্তু শ্রাবণের মেঘলা আকাশ ও ভরা বর্ষার মাঝে দেবী দুর্গার এমন জাঁকজমকপূর্ণ আবাহন সত্যিই বিরল। ৩০০ বছরের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য মেনে পূর্ব বর্ধমানের কালনায় মহাসমারোহে শুরু হলো ঐতিহাসিক মহিষমর্দিনী পুজো।
স্বপ্নাদেশ ও ইতিহাস: লোকশ্রুতি অনুযায়ী, কালনার স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ঈশ্বরীপ্রসাদ পালচৌধুরী স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে এই বিশেষ পুজোর সূচনা করেছিলেন। কালক্রমে নানা মতান্তর তৈরি হলেও কালনাবাসীর কাছে এই মহিষমর্দিনী দেবীই পরম রক্ষাকর্ত্রী ও জাগ্রত রূপ। বছরের নির্দিষ্ট চার দিন মূল পুজো হলেও সারা বছরই মন্দিরে নিত্য আরাধনা চলে।
আরও পড়ুনঃ ‘নাড্ডার সঙ্গে বসিনি,’ সটান অস্বীকার TMC-র সৌগতর
প্রতিমার অনন্য গঠন ও বৈশিষ্ট্য: মহিষমর্দিনী দেবীর রূপ হুবহু দেবী দুর্গার মতো হলেও এখানে প্রতিমার কাঠামোয় রয়েছে বিশেষত্ব:
-
একা দেবী: এখানে দেবীর পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ কিংবা শিবের উপস্থিতি নেই। একচালার কাঠামোয় দেবীর দু’পাশে অবস্থান করেন তাঁর দুই প্রিয় সখী—জয়া ও বিজয়া।
-
রূপের শ্রী: দেবীর মুখমণ্ডল সাধারণ প্রতিমার চেয়ে কিছুটা বড়, গায়ের রং সনাতনী হলুদ এবং চোখে-মুখে প্রশান্ত সদাহাস্য ভাব। বিপরীত দিকে, পদতলে থাকা মহিষাসুরের গায়ের রং গাঢ় সবুজ ও রূপ বেশ ভয়াল।

পুজোর নিয়ম ও বলিদান: শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী—এই চার দিন ধরে দেবীর আরাধনা চলে। পুজোয় ছাগবলির প্রথা বিদ্যমান; সাধারণত সপ্তমী ও অষ্টমীতে বলি হয় এবং নবমীতে থাকে বিশেষ মানসিক পুজো ও নৈবেদ্য নিবেদন।
আরও পড়ুনঃ এক চা-চক্রেই বই ও গাছের বিস্ময়: সেভক মোড়ে ২৫ বছরের অনন্য স্মৃতি ও সংগ্রামের গল্প
অন্ধকারে বিসর্জন ও ৭ দিনের নিয়ম: এই পুজোর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো এর নিরঞ্জন। প্রথা অনুযায়ী, গভীর রাতে সমগ্র কালনা শহর সম্পূর্ণ অন্ধকার (ব্ল্যাকআউট) করে দেবীর প্রতিমা গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। বিসর্জনের পর দেবীর কাঠামোটি টানা ৭ দিন গঙ্গায় নিমজ্জিত থাকে। সাত দিন পর সেই কাঠামো তুলে এনে পুনরায় মন্দিরে সংরক্ষণ করা হয় পরবর্তী বছরের পুজোর জন্য।
১৫ দিনের সুবিশাল মেলা: চার দিনের পুজো শেষ হলেও কালনার মেজাজ দমে না। মন্দির প্রাঙ্গণ ঘিরে শুরু হয় সুবিশাল মেলা, যা টানা ১৫ দিন ধরে চলে। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগমে মুখরিত হয় কালনা। ভক্তদের বিশ্বাস, এই জাগ্রত দেবীর কাছে মনে প্রাণে প্রার্থনা করলে মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না। শ্রাবণের ধারায় ঢাকের বাদ্যি আর মেলার রোশনাই মিলিয়ে কালনায় এখন থেকেই দুর্গাপুজোর আমেজ শুরু হয়ে গিয়েছে।


