বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক:
পৃথিবীর পড়শি গ্রহ মঙ্গল যে একসময় শুধু রুক্ষ লাল মরুভূমি ছিল না, বরং সেখানে টলটলে জল ও বিশাল সমুদ্র উথালপাথল করত—তার একাধিক প্রমান আগেই মিলেছে। তবে এবার এক নতুন চমকপ্রদ তথ্য নিয়ে হাজির হয়েছেন সুইৎজ়ারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষকদের একটি দল। তাঁদের দাবি, প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে মঙ্গলে কেবল জলই ছিল না, বরং পৃথিবীর মতোই সেখানে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হতো! আর এই জোয়ার-ভাটার পেছনে অবদান ছিল মঙ্গলের এক বিশাল ‘হারিয়ে যাওয়া’ শক্তিশালী উপগ্রহের।
শিলাস্তরে জোয়ার-ভাটার সংকেত
মঙ্গলের নিরক্ষরেখার দক্ষিণে অবস্থিত বিশাল ‘গেল ক্রেটার’ (Gale Crater) ও ‘মাউন্ট শার্প’-এর নিচু ঢালে অনুসন্ধান চালিয়েছিল নাসার কিউরিওসিটি রোভার (Curiosity Rover)। সেখানকার ‘ভেরা রুবিন রিজ’ নামের শিলাস্তরে পাথরের বিন্যাস বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ঠিক পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার কারণে তৈরি হওয়া পলি ও পলল স্তরের মতো শৃঙ্খলিত বিন্যাস মঙ্গলের পাথরেও বার বার ফিরে এসেছে। এই গবেষণার ফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘এনপিজে স্পেস এক্সপ্লোরেশন’ (npj Space Exploration) জার্নালে।
আরও পড়ুনঃ উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালের হাল ফেরাতে কড়া পদক্ষেপ
লুকিয়ে থাকা হারানো উপগ্রহের রহস্য
পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার মূল কারিগর আমাদের চাঁদ। কিন্তু বর্তমানে মঙ্গলের যে দু’টি উপগ্রহ রয়েছে—ফোবোস (Phobos – ব্যাস ২২ কিমি) এবং ডিমোস (Deimos – ব্যাস ১৫ কিমি)—তারা এতটাই ছোট ও পাথরখণ্ডের মতো যে তাদের পক্ষে মঙ্গলের বিশাল সমুদ্রের জলে জোয়ার-ভাটা ঘটানো একেবারেই অসম্ভব।
বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাস টমাস এবং লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক সুনীতি করুণাতিল্লেকে জানান:
“মঙ্গলের শিলাস্তরে যে প্রাচীন জোয়ার-ভাটার চিহ্ন মিলছে, তার জন্য ফোবোসের চেয়ে অন্তত ১৫ গুণ বড় ভরের একটি শক্তিশালী উপগ্রহের প্রয়োজন ছিল। মঙ্গল থেকে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে সেটি প্রদক্ষিণ করত এবং এর আকর্ষণেই লাল গ্রহের সমুদ্রে জল ফুলে উঠত।”
কোথায় হারিয়ে গেল সেই বৃহৎ উপগ্রহ?
বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গলের মহাজাগতিক উপগ্রহ ব্যবস্থা স্থায়ী হয় না। জোয়ার-ভাটার টানে ও মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে প্রাচীন সেই বড় উপগ্রহটি ধীরে ধীরে মঙ্গলের খুব কাছে চলে আসে। এক পর্যায়ে মঙ্গলের তীব্র টানে সেটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গ্রহটির চারপাশে ধূলিকণা ও পাথরের বলয়ে পরিণত হয়। পরবর্তীতে সেই বলয়ের ধ্বংসাবশেষ একত্রিত হয়েই জন্ম নেয় আজকের ফোবোস ও ডিমোস।
আরও পড়ুনঃ প্রশ্নফাঁস রুখতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ; সংসদে পাস ‘পাবলিক এক্সামিনেশন সোধনী বিল, ২০২৬’, কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর
একই ধ্বংসের পথে বর্তমান উপগ্রহগুলিও!
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে বর্তমান উপগ্রহগুলির ভাগ্যও একইভাবে নির্ধারিত হচ্ছে:
-
ফোবোস: প্রতি বছর একটু একটু করে মঙ্গলের দিকে এগিয়ে আসছে। হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক কোটি বছরের মধ্যে এটি মঙ্গলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বা মহাকর্ষের টানে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।
-
ডিমোস: অন্যদিকে ডিমোস ধীরে ধীরে মঙ্গল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একদিন হয়তো এটি মঙ্গলের মহাকর্ষ পেরিয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে।
মঙ্গলের উপগ্রহগুলির এই রহস্য উন্মোচনে ২০২৬ সালের শেষ দিকে জাপান পাঠাতে চলেছে তাদের বিশেষ মহাকাশযান ‘মার্শিয়ান মুন্স এক্সপ্লোরেশন’ (MMX)। সেই অভিযান থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে লাল গ্রহের অতীত, সমুদ্র ও হারানো উপগ্রহের বিষয়ে আরও বিস্ময়কর সত্য সামনে আসবে বলে আশা করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।


