বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি:
উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর অয়েল ফিল্ড থেকে বাণিজ্যিক তেল উত্তোলন ও তার হলদিয়া রিফাইনারিতে প্রেরণকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০১৮ সালে অন্বেষণকারী সংস্থা ওএনজিসি (ONGC) এখানে বিপুল খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার করে বর্তমানে এই প্রকল্প থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে চলেছে। এই প্রকল্পের ইতিহাস, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, নীতিগত পরিবর্তন এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
আরও পড়ুনঃ ধোঁয়ায় ঢাকল এলাকা, বড়সড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেল কিডস স্কুল; পানাগড়ে কাকভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
অশোকনগর প্রকল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অন্বেষণ
ভারতে স্বাধীনতার পর ১৯৫৪ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে ‘ইন্দো-স্ট্যানভ্যাক প্রজেক্ট’-এর অধীনে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও ২৪ পরগনার বিভিন্ন অঞ্চলে অনুসন্ধান চালানো হলেও তৎকালীন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে বাণিজ্যিক তেলের সন্ধান মেলেনি। পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে ২০১৮ সালে কলকাতা থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে অশোকনগরে উচ্চমানের ‘লাইটের ক্রুড অয়েল’ ও গ্যাসের উপস্থিতি সুনিশ্চিত করে ONGC।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের মে মাসে খনন করা নতুন ‘Well AS-1Z’ থেকে দ্রুততার সাথে বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হয়েছে এবং গত ২৮ আগস্ট ২০২৬-এ উৎপাদিত ক্রুড অয়েলের প্রথম কনসাইনমেন্ট ইন্ডিয়ান অয়েলের হলদিয়া রিফাইনারিতে পাঠানো হয়।
বিলম্বের কারণ ও প্রশাসনিক জটিলতা
অশোকনগর প্রকল্পে পেট্রোলিয়াম মাইনিং লিজ (PML) প্রদান, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া, রয়্যালটি বণ্টন এবং প্রশাসনিক অনুমোদন নিয়ে কেন্দ্র ও তৎকালীন রাজ্য সরকারের মধ্যে দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলে।
-
পেট্রোলিয়াম মাইনিং লিজ (PML): খনি থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য রাজ্য সরকারের তরফে PML অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা প্রশাসনিক পর্যালোচনার কারণে বেশ কয়েক বছর ঝুলে ছিল।
-
কেন্দ্র-রাজ্য চিঠিপত্র: ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তরফে রাজ্য প্রশাসনকে একাধিকবার রিমাইন্ডার পাঠানো হয়। প্রশাসনিক সম্মতি মেলানোর পর কাজ দ্রুত গতিতে এগোতে শুরু করে।
হাইড্রোকার্বন নীতির পরিবর্তন: NELP থেকে HELP
ভারতে জ্বালানি খাতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে এবং উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে কেন্দ্রীয় নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে:
| সুচক | পুরনো নীতি (NELP – 1997) | নতুন নীতি (HELP – 2016) |
| লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া | তেল, গ্যাস বা কোল-বেড মিথেনের জন্য পৃথক লাইসেন্সের প্রয়োজন হতো। | একক লাইসেন্স (Single License): একটি লাইসেন্সেই সমস্ত হাইড্রোকার্বন অন্বেষণ সম্ভব। |
| আর্থিক মডেল | Profit Sharing Model: জটিল লাভ-ভাগাভাগি ও সরকারি অডিট প্রক্রিয়া। | Revenue Sharing Model: সরাসরি রাজস্ব ভাগাভাগি, আমলাতান্ত্রিক অডিট মুক্ত। |
| মূল্য নির্ধারণ | সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকত। | বাজারভিত্তিক স্বাধীনতা: সংস্থাগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাম নির্ধারণের অধিকার পায়। |
আরও পড়ুনঃ যৌথ বিবৃতিতে অনিশ্চয়তা; ব্রিকস সম্মেলনে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ভারত
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বাণিজ্যিক উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে এই প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক মানচিত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে:
১. কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন: স্থানীয় স্তরে পরিবহন, রিফাইনারি পরিষেবা ও আনুষঙ্গিক শিল্পক্ষেত্রে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
২. রাজস্ব বৃদ্ধি: খনিজ তেল উৎপাদনের ফলে রাজ্য সরকারের ঘরে বিপুল পরিমাণ রয়্যালটি আসবে, যা আর্থিক ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে।
৩. ইসরো-র ন্যায় সূচনা: বাণিজ্যিক উৎপাদনের সূচনালগ্নে দৈনিক সরবরাহ কম থাকলেও (যেমন প্রাথমিক ট্যাঙ্কারে ১২,০০০ লিটার ক্রুড অয়েল প্রেরিত হয়েছে), বিশেষজ্ঞরা এটিকে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ISRO-র প্রাথমিক দিনগুলোর সাথে তুলনা করে দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক বিতর্ক ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ঊর্ধ্বে উঠে অশোকনগর অয়েল ফিল্ডের পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গকে দেশের জাতীয় জ্বালানি মানচিত্রে এবং শিল্পায়নের অগ্রগতির পথে কতটা এগিয়ে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার।


