নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম BRICS সম্মেলনে গৃহীত ‘নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন’ (New Delhi Declaration) স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, BRICS কোনো একক বা সাঝা কারেন্সি (Common Currency) চালুর পরিকল্পনা করছে না। বিষয়টিকে যেভাবে সংবাদমাধ্যমে “ডলারের পতন” বা “নতুন কারেন্সি আগমন” হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল, আসল পরিস্থিতি তার থেকে বেশ আলাদা।
আরও পড়ুনঃ তারিখ তো বদলায় না; তবে তুমি এক দিন পরে কেন আসছ ঠাকুর?
১. কমন কারেন্সি কেন বাস্তবে অসম্ভব?
ইউরোর (Euro) মতো একটি কমন কারেন্সি তৈরি করতে হলে সদস্য দেশগুলোকে নিজেদের স্বায়ত্তশাসিত মুদ্রানীতি (Monetary Policy) এবং সুদের হার নির্ধারণের ক্ষমতা ত্যাগ করতে হয়।
-
অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য: ভারত, চীন, ব্রাজিল, রাশিয়া কিংবা আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো ও সমস্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর অর্থনীতির জন্য একই নীতি কার্যকর হতে পারে না।
-
রাজনৈতিক ভারসাম্য: চীনের মুদ্রা ইউয়ান (RMB) বিশ্ববাজারে প্রভাবশালী হলেও ভারত বা অন্য সদস্যরা চীনা মুদ্রার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে আগ্রহী নয়।
-
ভারতের অবস্থান: শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনেই পররাষ্ট্র সচিব পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে BRICS-এর এই মুহূর্তে কোনো নিজস্ব একক মুদ্রার প্রস্তাব নেই।
২. BRICS-এর আসল কৌশল: Local Currency & System Linkage
একক মুদ্রার বদলে BRICS দেশগুলো দ্বিপাক্ষিক নিজস্ব মুদ্রায় (Local Currency Settlement) লেনদেন বাড়ানোর বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণ করেছে:
| ক্ষেত্র | BRICS-এর বর্তমান পদক্ষেপ | কৌশলগত উদ্দেশ্য |
| দ্বিপাক্ষিক লেনদেন | রুপি, রুবেল, রেনমিনবি বা রিয়ালে সরাসরি আমদানি-রপ্তানি মেটানো। | ডলারে রূপান্তরের অতিরিক্ত খরচ ও ঝুঁকি কমানো। |
| পেমেন্ট নেটওয়ার্ক | ভারতের UPI-এর মতো ডিজিটাল পরিকাঠামো অন্য সদস্যদের সাথে যুক্ত করা। | SWIFT ব্যবস্থার বিকল্প আন্তঃদেশীয় পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি। |
| New Development Bank (NDB) | সদস্য দেশগুলোকে নিজস্ব মুদ্রায় ঋণপ্রদানের হার ৪০-৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা। | বৈদেশিক মুদ্রার ঋণসংক্রান্ত আর্থিক ঝুঁকি কমানো। |
আরও পড়ুনঃ ইঞ্জিনে গোলযোগ, কেবিনে আতঙ্ক, জরুরি অবতরণ করল ইরানের বোয়িং ৭৩৭
৩. বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের ভূমিকা কি বদলে যাবে?
BRICS-এর এই ধরনের পদক্ষেপে ডলার রাতারাতি অপসারিত হবে না, তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার বহুমাত্রিকতা (Multipolarity) বৃদ্ধি পাবে।
-
ডলারের আধিপত্য বজায় থাকবে: আন্তর্জাতিক রিজার্ভের অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৫৭%) এখনও মার্কিন ডলারে সংরক্ষিত এবং বিশ্ব বাণিজ্য লেনদেনের প্রায় ৮৯% ডলারের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
-
বিকল্প ব্যবস্থার জন্ম: পশ্চিমের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা মার্কিন বাণিজ্য নীতির ঝুঁকি এড়াতে BRICS-এর সদস্য দেশগুলো নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিকল্প বিকল্প পথ তৈরি করছে।
-
ডি-ডলারাইজেশন একটি ধীর প্রক্রিয়া: BRICS বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে এক মেরু থেকে সরিয়ে একাধিক মুদ্রানির্ভর আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
BRICS মার্কিন ডলারকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে চাইছে না; বরং ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ও মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের বাণিজ্য সুরক্ষিত করতে চাইছে।


