বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি:
ফ্রান্সের রাজনৈতিক পথ ধরে এবার বিশ্ব রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম গণতন্ত্র ব্রাজিল। সে দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থী মতাদর্শের পুনরুত্থান এবং প্রাক্তন বিতর্কিত রাষ্ট্রপতি জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর সম্ভাব্য ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল সে দেশের ‘জেন জি’ (Gen-Z) অর্থাৎ তরুণ প্রজন্ম। রিয়ো ডি জেনেইরোর প্রাণকেন্দ্রে হাজার হাজার পটুয়া, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও তরুণ পেশাজীবীরা রাজপথে নেমে নজিরবিহীন প্রতিবাদ সমাবেশ গড়ে তুলেছেন।
আগামী ২৫শে অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে চলা দ্বিতীয় পর্বের (Run-off) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঠিক মুখে তরুণ প্রজন্মের এই বিদ্রোহ ব্রাজিলের রাজনৈতিক সমীকরণকে চরম উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ নির্বাচন কমিশন ভাঙার ষড়যন্ত্র নাকি ভোটারদের অধিকার রক্ষা! জ্ঞানেশের পক্ষে ৪২ প্রাক্তন বিচারপতির ঢাল
প্রথম দফার বিস্ময়জনক ফল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
সদ্য সমাপ্ত প্রথম দফার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো প্রার্থীই এককভাবে ৫০ শতাংশ ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারেননি।
-
ফ্লাভিও বলসোনারোর চমক: জেলবন্দি প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ পুত্র সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো অপ্রত্যাশিতভাবে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছেন।
-
লুলা দা সিলভার ধাক্কা: বর্তমান বামপন্থী রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা পেয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ ভোট।
-
২৫শে অক্টোবরের ফাইনাল: যেহেতু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তাই আগামী ২৫শে অক্টোবর রান-অফ নির্বাচনে এই দুই মেরুর সরাসরি মুখোমুখি লড়াই হবে, যেখানে দক্ষিণপন্থী শিবিরের পাল্লা কিছুটা ভারী বলেই ভোট সমীক্ষায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
‘ট্রাম্পের ছায়া ও আমেরিকার উপনিবেশ হওয়ার ভয়’: জেন জি-র ক্ষোভ
রিও ডি জেনেইরোর কেন্দ্রস্থলে মিছিলকারীদের হাতে ছিল একগুচ্ছ বার্তা—‘বলসোনারো কখনও নয়’, ‘বাবাকে নয়, ছেলেকেও নয়’ এবং ‘কখনও স্বৈরাচার নয়’। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ও আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের এই ক্ষোভের মূলে রয়েছে স্বৈরাচার ফিরিয়া আসার আশঙ্কা।
-
‘আমেরিকার কলোনি হওয়ার শঙ্কা’: আন্দোলনকারী ২০ বছর বয়সী সাহিত্য পড়ুয়া জোয়াও ভিক্টর ভিয়েরা তোপ দেগে বলেন— “ফ্লাভিও জিতলে ব্রাজিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত হবে।” দক্ষিণপন্থী এই সেনেটরের মতাদর্শের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ট যোগাযোগ ও নীতির মিল নিয়ে গভীর চিন্তিত সে দেশের বামপন্থী যুবসমাজ।
-
‘গণতন্ত্রের বিপদ’: ২৫ বছর বয়সী প্রশাসনিক কর্মী এলিস কার্নেইরো জানান, দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতায় এলে দেশে বাকস্বাধীনতা ও বৈচিত্র ধ্বংস হবে। ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইম্যানুয়েল আরাউজোর মতে— “বলসোনারোবাদের মতো উগ্র মতাদর্শকে থামাতে তরুণ প্রজন্মকেই উদ্যোগ নিতে হবে।”
আরও পড়ুনঃ ‘অম্বানী কি ভারতের আসল মালিক?’ স্টারলিঙ্ক জটিলতায় মাস্কের বিস্ফোরক পোস্ট
লুলা বনাম বলসোনারো: লাতিন আমেরিকার ক্ষমতার সমীকরণ
| প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী | রাজনৈতিক অবস্থান | জেন জি আন্দোলনের অভিমুখ |
| ফ্লাভিও বলসোনারো (PL) | উগ্র দক্ষিণপন্থী, মার্কিনপন্থি ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সন্তান। | “স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি ও পিতাকে আইনি ক্ষমা পাইয়ে দেওয়ার চক্রান্ত।” |
| লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা (PT) | বামপন্থী, বর্তমান রাষ্ট্রপতি। | “গণতন্ত্র, সামাজিক সুরক্ষা ও সংবিধান রক্ষার শেষ ভরসা।” |
দক্ষিণপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো কেবল তাঁর পিতার দুর্নীতি ঢাকা বা তাঁকে জেল থেকে মুক্ত করার সওয়ালই করেননি, বরং একাধিক ক্ষেত্রে উগ্র বাজারকেন্দ্রিক ও জাতীয়তাবাদী নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইউরোপের পর লাতিন আমেরিকার মাটিতে জেন জি-দের এই রাজপথ দখল ২৫শে অক্টোবরের ভোটে কী প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা।


