বিশেষ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিবন্ধ:
রাত পোহালেই মহালয়া। ভোরের কুয়াশামাখা বাতাসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই অমর, উদাত্ত চণ্ডীপাঠ আর শঙ্খধ্বনি যখন ভেসে আসবে, তখন শিহরিত হবে বাংলা। অথচ শাস্ত্র, দর্শন ও স্মৃতির নিরিখে মহালয়া কেবল কোনো চটুল উৎসবের সূচনা নয়—এটি আলোর রোশনাইয়ের ঠিক মুখে দাঁড়িয়ে অতীত ও পূর্বপুরুষের মায়াময় ছায়ার সামনে দাঁড়ানোর এক পরম তিথি। মহালয়া হলো জীবিতের সঙ্গে বিদেহীর, অন্ধকারলোকের সাথে আলোকলোকের এক নিভৃত ও মানবিক সেতু।
আরও পড়ুনঃ লজ্জা, ধ্বংসাত্বক বিপর্যয় লালেদের; মানুষ জোড়া কেন্দ্র মিলিয়ে বামেদের ১০ হাজার ভোটও দিলো না
শব্দার্থ, শাস্ত্র ও কর্ণের পৌরাণিক প্রায়শ্চিত্ত
‘মহা’ ও ‘আলয়’—এই দুই শব্দ নিয়ে গড়ে ওঠা ‘মহালয়া’ শব্দের অর্থ হলো সেই পরম আশ্রয়, যেখানে পরমাত্মায় মিলনের অপেক্ষায় থাকা সমস্ত বিদেহী আত্মা এসে সমবেত হন।
-
পরলোকের দ্বার উন্মোচন: ভাদ্র-আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষটি হলো ‘পিতৃপক্ষ’। এর শেষ তিথি অর্থাৎ ‘সর্বপিতৃ অমাবস্যা’ই মহালয়া। শাস্ত্রমতে, এই বিশেষ দিনে পরলোকের দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং পূর্বপুরুষেরা উত্তরসূরিদের গণ্ডূষ জল গ্রহণের জন্য মর্ত্যের কাছাকাছি নেমে আসেন। Markandeya, Brahma ও Skanda Puran-এ এই তিথির মহিমা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
-
দানবীর কর্ণের আখ্যান: মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর স্বর্গে পৌঁছে দানবীর কর্ণ খাদ্য হিসেবে কেবল সোনা ও রত্ন পেয়েছিলেন। কারণ জীবদ্দশায় তিনি ধনসম্পদ অকাতরে দান করলেও পূর্বপুরুষদের জন্য জল বা অন্ন দেননি (যেহেতু তিনি নিজের জন্মপরিচয় জানতেন না)। দেবরাজ ইন্দ্রের অনুগ্রহে ১৬ দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে এসে কর্ণ তিল ও জল দিয়ে পিতৃপুরুষের তর্পণ করেছিলেন। যে তিথিতে তাঁর এই প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণ হয়, সেটিই ছিল আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা।
‘বসুধৈব কুটুম্বকম’: তর্পণের সর্বজনীন মানবিক আবেদন
গঙ্গার ঘাটে কুশ ও তিল হাতে উত্তরসূরিদের যে তর্পণ, তা কোনো অন্ধ সামাজিক কুসংস্কার নয়; তা বংশপরম্পরার প্রতি এক গভীর মানবিক ঋণস্বীকার।
তর্পণ মন্ত্রের নির্যাস:
“আব্রহ্মভুবনাল্লোকা দেবর্ষিপিতৃমানবাঃ…”
তর্পণের শেষ লগ্নে কেবল নিজের তিন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের নামগোত্রহীন, অনাথ এবং যাঁদের শ্রাদ্ধ করার মতো কেউ বেঁচে নেই—সেই সমস্ত তৃষ্ণার্ত অচেনা আত্মার উদ্দেশ্যেও জল উৎসর্গ করা হয়। মানুষের স্মৃতির এমন সর্বজনীন বিস্তার বিশ্ব সংস্কৃতিতে বিরল।
আরও পড়ুনঃ মহালয়ায় তর্পণ ঘিরে গঙ্গার ঘাটে আঁটসাঁট নিরাপত্তা, থাকছে ভাসমান ব্যারিকেড ও বায়ো-টয়লেট
রেডিওর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ ও বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব
একটি গম্ভীর, বিষাদমাখা পিতৃশ্রাদ্ধের দিন কীভাবে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনন্দদায়ক প্রবেশদ্বারে পরিণত হলো? এর নেপথ্যে রয়েছে ১৯৩১ সালে তৎকালীন আকাশবাণী কলকাতা (ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং সার্ভিস) স্টুডিওর এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।
-
চার দিকপালের সৃষ্টি: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার, পঙ্কজ কুমার মল্লিক এবং রাইচাঁদ বড়াল—এই চার মহামানবের হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।
-
ঘাট থেকে গৃহকোণে: রেডিওর ভোর চারটের সেই জীবন্ত (Live) সম্প্রচার তর্পণের শূন্যতার সাথে জুড়ে দিল অসুরবিনাশিনী দুর্গার আগমনবার্তা। কুমোরটুলিতে শিল্পীদের দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তিতে ‘চক্ষুদান’ আর রেডিওর সুধা—একাকার হয়ে মহালয়াকে বানিয়ে তুলল শারদোৎসবের আবেগঘন সূচনা।
একদিকে গঙ্গার ঘাটে ভেজা কাপড়ে পিতৃপুরুষকে জল দেওয়ার নিঃশব্দ হাহাকার, আর অন্যদিকে ঘরে ঘরে আগমনী সুরে চঞ্চল শৈশব—মহালয়া আসলে অতীতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আগামীর আলোকে বরণ করে নেওয়ার এক চিরন্তন বাঙালি আত্মপরিচয়।


