Sunday, 25 October, 2026
25 October
HomeকলকাতাJogen Chowdhury: উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ; প্রয়াত যোগেন চৌধুরী, তুলির...

Jogen Chowdhury: উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ; প্রয়াত যোগেন চৌধুরী, তুলির টান থামল চিরতরে

কলকাতায় নিজের হাতে গড়া ‘চারুবাসনা দ্য যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’ তাঁর শিল্পপ্রেমের স্থায়ী স্মারক হয়ে রয়ে গেল।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

বিশেষ সাংস্কৃতিক ও শোকসংবাদ প্রতিবেদন:

দেশভাগের নির্মম ট্র্যাজেডি যাঁকে উদ্বাস্তু করেছিল, সেই জীবনের ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ আর মানব শরীরের জৈবিক রূপই যাঁর তুলির প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছিল, আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার সেই দিকপাল স্তম্ভ যোগেন চৌধুরী আর নেই। দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে ক্যানসারের সঙ্গে অসম লড়াইয়ের পর রবিবার সকালে কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮৭ বছর বয়সি এই প্রখ্যাত শিল্পী।

তাঁর প্রয়াণে বাংলা তথা ভারতীয় শিল্পজগতে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।

আরও পড়ুনঃ  ট্রাম্পের হুমকির মুখেও অনমনীয় তেহরান; ‘আজই ইরান আক্রমণ করতে পারি’ জানিয়ে দিলেন ট্রাম্প

হাসপাতালে ভর্তি ও শেষ জীবন

পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে খবর, ক্যানসারের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে মূত্রনালীর সংক্রমণেও ভুগছিলেন বর্ষীয়ান এই শিল্পী। শারদীয়া দুর্গোৎসবের ষষ্ঠীর দিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত কয়েক দিন ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক ছিল। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে রবিবার সকালে চিরতরে থেমে গেল তাঁর জীবনরেখা।

দেশভাগের ক্ষত থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি

১৯৩৯ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুরের দহরপাড়া গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্ম হয়েছিল যোগেন চৌধুরীর। তাঁর পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী জমিদার হলেও, শিল্পীর মন খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর মায়ের। মায়ের উৎসাহেই তাঁর আঁকার হাতেখড়ি। কলকাতার নিজের বাড়ির দেওয়ালে একটি ময়ূরের ছবি এঁকে তিনি তাঁর জীবনের প্রথম চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন।

দেশভাগের মর্মান্তিক বিভীষিকা তাঁর পরিবারকে উদ্বাস্তু করে তোলে। সেই উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা এবং মানুষের সংগ্রামই পরবর্তীকালে তাঁর শৈল্পিক ভাবনার মূল ভিত হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৬০ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন প্যারিসে। সেখানে ‘ইকোল দ্য বোজা’ (Ecole des Beaux Arts) এবং উইলিয়াম হেইটারের বিখ্যাত ‘অ্যাটেলিয়ার ১৭’-এ (Atelier 17) অঙ্কন ও মুদ্রণশিল্পের ওপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ইউরোপ তাঁকে রেখা জালের কারসাজি শেখালেও, তাঁর মনের গভীরে বরাবর বেঁচে ছিল বাংলার শিকড়।

তুলির টানে অনন্য রেখা জাল ও মানবিক রূপ

যোগেন চৌধুরীর চিত্রকলার সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য ছিল তাঁর ছবির অভিনব বুনন ও ক্রস-হ্যাচিং বা আড়াআড়ি রেখার জাদুকরি ব্যবহার। তিনি বলতেন, “শরীর এক জৈবিক বিস্ময়।” তাঁর ছবিতে সেই বিস্ময় নানা মাত্রায় ফুটে উঠেছে। কালি, পেস্টেল ও জলরঙে আঁকা তাঁর কাজগুলিতে সাধারণ মানুষের ফোলা, বিকৃত অথচ অদ্ভুত মানবিক মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানা তাঁকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। তাঁর আঁকা গণেশ, যুগল বা দম্পতি এবং সাধারণ নারী চরিত্রগুলি ভারতীয় আধুনিক শিল্পে এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিল।

পাশাপাশি, সমাজ ও রাজনীতির নানা কদর্য দিক নিয়ে তাঁর আঁকা ব্যঙ্গাত্মক চিত্রগুলোও তৎকালীন শিল্পজগতে দারুণ আলোড়ন ফেলেছিল।

আরও পড়ুনঃ  যে প্রতিশ্রুতির বাঁধনে দেবী লক্ষ্মী আজও বন্দি! জগৎ শেঠ ও পদ্মাবতীর সেই অমলিন কোজাগরী কথা

কর্মজীবন ও সম্মাননা

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি যেমন শিল্পচর্চা করেছেন, তেমনই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলেছেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিনিকেতন কলাভবনের অধ্যাপক এবং অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন।

তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেছেন একের পর এক মর্যাদাপূর্ণ সম্মান। ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ’ সম্মান ছাড়াও তিনি ললিত কলা অকাদেমি পুরস্কার এবং ফ্রান্সের ‘প্রিক্স দে লা জঁ পেন্তুর’ (Prix de la Jeune Peinture)-এর মতো আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেছেন। ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে তিনি রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর কাছে তাঁর স্টুডিও এবং ক্যানভাসই ছিল সবচেয়ে বড় পরিচিতি। কলকাতায় নিজের হাতে গড়া ‘চারুবাসনা দ্য যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’ তাঁর শিল্পপ্রেমের স্থায়ী স্মারক হয়ে রয়ে গেল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা যামিনী রায়ের পর বাংলা চিত্রকলায় নিজস্ব ব্যাকরণ ও স্বকীয় ভাষা তৈরি করতে পেরেছিলেন যে কয়েকজন শিল্পী, যোগেন চৌধুরী ছিলেন তাঁদেরই অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। তাঁর জীবনরেখা থেমে গেলেও, তাঁর রেখার জাদুতে আর তুলির মায়াজালে চিরকাল আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে শিল্পের দুনিয়া।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন