বিশেষ অপরাধ ও রাজনৈতিক প্রতিবেদন:
ইউনেস্কোর (UNESCO) নাম ভাঙিয়ে দুর্গাপুজোর ভুয়া পাস বিক্রি ও কোটি কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতি মামলায় রাজ্য রাজনীতিতে বড়সড় চমক। বুধবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে (CGO Complex) কেন্দ্রীয় সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) মুখোমুখি হয়ে বেরোনোমাত্রই চন্দননগরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে (Indranil Sen) গ্রেফতার করল কলকাতা পুলিশ। তদন্তে ধারাবাহিক অসহযোগিতার অভিযোগেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ শিলিগুড়ি পুরভোটে বিজেপি-বিরোধিতায় জোটের ডাক গৌতম দেবের, পাত্তাই দিল না সিপিআইএম
সিজিও কমপ্লেক্সের বাইরে নাটকীয় গ্রেফতারি
দুর্গাপুজো ও লক্ষ্মীপুজো মেটার পর বুধবার পুজো পাস দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় ইডির তলবে সিজিও কমপ্লেক্সে পৌঁছান ইন্দ্রনীল সেন। তবে তিনি ভেতরে পৌঁছানোর পরপরই সিজিও কমপ্লেক্সের বাইরে পৌঁছায় কলকাতা পুলিশের বিশাল বাহিনী। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিকেল গড়াতেই প্রাক্তন মন্ত্রী ইডি দফতর থেকে বাইরে পা রাখা মাত্রই পুলিশ আধিকারিকেরা তাঁকে ঘিরে ধরেন এবং নিজেদের গাড়িতে তুলে সোজা লালবাজার পুলিশ সদর দফতরে নিয়ে যান।
কলকাতা পুলিশের দাবি, এই দুর্নীতির মূল অভিযোগটি দায়ের করা হয়েছিল বৌবাজার থানায়। ফলে ইডির সমান্তরাল তদন্তের পাশাপাশি পুলিশি তদন্তেও অসহযোগিতা করায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া তোপ: ‘মমতার প্রত্যক্ষ মদতেই এই দুর্নীতি’
ইন্দ্রনীল সেনের এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির খবর ছড়াতেই নবান্নে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে কড়া বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন:
“ওঁর বিরুদ্ধে ইডি এবং কলকাতা পুলিশ দুই সংস্থাই তদন্ত করছিল। পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমি বহু রাজনৈতিক সভায় আগেই বলেছি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ মদতেই এই দুর্নীতি হয়েছে। একা তো আর খাননি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরও নিশ্চয়ই ভাগ থাকতে পারে। ওঁর সঙ্গে একই গাড়িতে ঘুরতেন, গান গাইতেন। এরা সময়ে সময়ে রং বদলায়, কিন্তু আমাদের সরকারে এসব বরদাস্ত করা হবে না।”
কী এই ইউনেস্কো ও পুজোর পাস দুর্নীতি?
প্রশাসনিক ও ইডি সূত্রে খবর, অভিযোগের শিকড় ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজোর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সম্মান প্রাপ্তির মধ্যে নিহিত।
-
ভুয়া প্রিভিউ শো ও টিকিটের চড়া দাম: শহরের বাছাই করা ২৪টি বড় পুজো মণ্ডপে আন্তর্জাতিক পর্যটক ও পুজোপ্রেমীদের জন্য ‘প্রিভিউ শো’ এবং ‘প্রিভিলেজড পুজো এন্ট্রি’র নামে চড়া দামে টিকিট ও পাস বিক্রি করা হচ্ছিল।
-
ইউনেস্কোর নাম অপব্যবহার: প্রচারে দাবি করা হয়েছিল, এই উদ্যোগের সঙ্গে ইউনেস্কোর সরাসরি অনুমোদন বা বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে। বাস্তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো এমন কোনো চুক্তিই করেনি।
-
৫০-৬০ কোটি টাকার আর্থিক তছরুপ: ইডির প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সংস্থার নাম অপব্যবহার করে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার দুর্নীতি চালানো হয়েছে। ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী মধুছন্দা সেন পরিচালিত ‘মাস আর্ট’ (Mass Art) নামক সংস্থার মাধ্যমেই এই টাকার সিংহভাগ লেনদেন হয়েছিল বলে ইডির অভিযোগ।
-
বৌবাজার থানায় এফআইআর: জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তির দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতা পুলিশের বৌবাজার থানায় প্রথম লিখিত এফআইআর (FIR) রুজু হয়। এর পর ইডি-ও বেআইনি অর্থ লেনদেনের তদন্তে নামে।
আরও পড়ুনঃ সব কি ঠিক হয়ে গেল? শেষে BJP জোটে যোগ দিচ্ছেন অভিজিৎ দীপকে!
উচ্চ আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট: আইনি জটের মধ্যেই গ্রেফতারি
গ্রেফতারি এড়াতে ইডি ও পুলিশের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন জানিয়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন। কিন্তু হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করার পর তিনি শীর্ষ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।
তবে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের এজলাসে শুনানির জন্য উঠলে, তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বেঞ্চ থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে মামলাটিতে আইনি জটিলতা তৈরি হয় এবং কোনো রক্ষাকবচ পাওয়ার আগেই বুধবার ইডি দফতর থেকে বেরোনোর মুখে লালবাজারের জালে ধরা পড়লেন প্রাক্তন মন্ত্রী।


