কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে ফের বড়সড় বিপর্যয়। নেপালের প্রাকৃতিক দুর্যোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার হিমবাহ হ্রদ বা গ্লেসিয়াল লেক (Glacial Lake) ফেটে বিপদের মুখে পড়ল ভুটান। ওই দেশের শিনতাফু হ্রদ ফেটে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ জল হুড়মুড়িয়ে নেমে আসায় নিম্নাঞ্চলে তৈরি হয়েছে প্রবল প্লাবনের আশঙ্কা। এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে ভারতে। ভুটানের নদীবাহিত জল বিপুল গতিতে নেমে আসায় আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও কোচবিহারসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ এবং অসমের ধুবরি জেলায় চরম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ঠিক কী ঘটেছে ভুটানের ওয়াকিলা পর্বতে?
ঘটনার কেন্দ্রে ভুটানের গাসা জেলার লায়া গেওগের লুঙ্গো এলাকায় ওয়াকিলা পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত শিনতাফু লেক (Shintaphu Lake)।
-
হঠাৎ জলচ্ছ্বাস: বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভুটানের অন্যতম বিপজ্জনক ১৭টি হিমবাহ হ্রদের তালিকাভুক্ত এই শিনতাফু হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বিপুল পরিমাণে জল উপচে বের হতে শুরু করে।
-
সাইরেন বাজিয়ে সতর্কতা: পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে পাহাড়ি নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের স সতর্ক করতে তড়িঘড়ি সাইরেন বাজানো হয় এবং বিপদসংকুল এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
-
অস্পষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ: ভুটানের ন্যাশনাল সেন্টার ফর হাইড্রোলজি অ্যান্ড মেটিওরোলজি (NCHM)-এর আধিকারিকরা জানিয়েছেন, হ্রদ থেকে ঠিক কতটা জল বেরিয়ে এসেছে এবং তার ফলে পাহাড়ের নীচের অংশে কতটা ধ্বংসলীলা ঘটেছে, তা এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়।
গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF) কী?
প্রাকৃতিক নিয়মে পাহাড়ি হিমবাহ গলে তৈরি হয় লেক বা হ্রদ। হিমবাহ সংলগ্ন এলাকা মাটি, পাথর ও বরফের প্রাকৃতিক বাঁধ দিয়ে ঘেরা থাকে। কোনো কারণে সেই বাঁধ ভাঙলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে হঠাৎ করে লক্ষ লক্ষ কিউসেক জল একসঙ্গে তীব্র বেগে পাহাড়ের খাঁদ বেয়ে নেমে আসে। এই প্রাকৃতিক ঘটনাকেই বিজ্ঞানের ভাষায় গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF) বলা হয়। এর ফলে নদীখাতে জলস্তরের অনভিপ্রেত বৃদ্ধি ঘটে এবং জলের স্রোতে পাথর, কাদা ও উপড়ে যাওয়া গাছ এসে লোকালয়, রাস্তাঘাট, সেতু ও কৃষিজমি ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়।
ভারতে আশঙ্কার মেঘ: সঙ্কোশ নদীর জলস্তর বৃদ্ধির ইঙ্গিত
ভুটানের এই শিনতাফু হ্রদটি মূলতঃ পুনাৎসাংছু নদী অববাহিকায় অবস্থিত। এই নদীই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে সঙ্কোশ নদী (Sankosh River) নামে প্রবাহিত হয়েছে।
-
৬ থেকে ৮ ঘণ্টার সময়সীমা: ভুটান থেকে নেমে আসা এই ঢল ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত-ভুটান সীমান্তে আছড়ে পড়তে পারে বলে প্রাথমিক পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
-
উচ্চ সতর্কতায় উত্তরবঙ্গ ও অসম: শিনতাফু লেকের জল সঙ্কোশ নদীতে মিশলে আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও অসমের ধুবরি জেলার একাধিক নদী তীরবর্তী এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ জীবনের সেভিংস, ফিক্সড ডিপোজ়িটের জমানো পুঁজিতে থাবা! পিএনবি-র গ্রাহকদের ৩৫ কোটি টাকা গায়েব
প্রশাসনের তৎপরতা: উদ্ধারকাজে নামানো হলো NDRF ও SDRF
হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়ার খবর পাওয়ামাত্রই গতি বাড়িয়েছে কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।
-
বাহিনী মোতায়েন: পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ ও বক্সিরহাট সীমান্ত এলাকা এবং সঙ্কোশ নদীর অববাহিকায় অবিলম্বে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (SDRF) বিশেষ দল মোতায়েন করা হয়েছে।
-
বনমন্ত্রীর জরুরি আবেদন: পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী মনোজকুমার ওরাওঁ সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে সঙ্কোশ নদীর তীরবর্তী এলাকা, বিশেষ করে কুমারগ্রামের বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আকুল আবেদন জানিয়েছেন। এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে নদীতে জলের প্রভূত বৃদ্ধি হতে পারে বলে সতর্ক করে তিনি সাধারণ মানুষকে প্রশাসনিক নির্দেশাবলী মেনে চলার অনুরোধ জানান।
বর্তমানে উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলা প্রশাসন এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দল পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।


