Monday, 2 November, 2026
2 November
Homeদক্ষিণবঙ্গMedinipur: ৪৫০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও গা-ছমছমে মেদিনীপুরের লচি পোদ্দার কালীবাড়ি

Medinipur: ৪৫০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও গা-ছমছমে মেদিনীপুরের লচি পোদ্দার কালীবাড়ি

লচি পোদ্দার কালীবাড়ির বিসর্জন প্রক্রিয়া গোটা মেদিনীপুর শহরের এক অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক আকর্ষণ।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

বিশেষ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রত্ন-আলেক্ষ্য:

পশ্চিম মেদিনীপুর শহরের প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ও পুজোপার্বণের কথা উঠলে হবিবপুরের ‘লচি পোদ্দার কালীবাড়ি’-র নাম সবার আগে আসে। প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো এই কালীপুজো কেবল শহরের প্রাচীনতম পুজোই নয়, এর পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে থমথমে অলৌকিক ঘটনা, নিজস্ব কিছু অনন্য আচার এবং ঐতিহ্যবাহী বিসর্জন প্রথা।

আরও পড়ুনঃ শ্মশানের পোড়া কাঠ, নরমুণ্ড ও পঞ্চমুন্ডির আসনের রহস্যাবৃত গর্ভগৃহের ভয় ও ভক্তির অনন্য আধ্যাত্মিক দুনিয়া! উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়ার তারাশঙ্করী পীঠ

১. নামকরণের নেপথ্যে: ‘লক্ষ্মীনারায়ণ’ থেকে ‘লচি পোদ্দার’

‘লচি পোদ্দার’ নামটির উৎপত্তি নিয়ে অনেকের মনেই কৌতূহল কাজ করে।

  • পোদ্দার উপাধি: এই পুজোর প্রবর্তন করেছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী লক্ষ্মীনারায়ণ দে। তাঁর সুবিশাল ধানের গোলার ব্যবসা থাকার কারণে তৎকালীন সমাজে তাঁকে ‘পোদ্দার’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

  • নামের বিবর্তন: প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মীনারায়ণের নামের ‘লক্ষ্মী’ কালক্রমে লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে প্রথমে হয় ‘লছমি’ এবং সেখান থেকে রূপ নেয় ‘লচি’-তে। সেই থেকে লক্ষ্মীনারায়ণ পোদ্দারের প্রতিষ্ঠিত এই স্থানটি ‘লচি পোদ্দার কালীবাড়ি’ নামে সুপরিচিত লাভ করে।

২. নূপুরের শব্দ ও অলৌকিক স্বপ্নাদেশ

মন্দির প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে সাড়ে চারশো বছর পুরোনো এক গায়ে কাঁটা দেওয়া লোকগাথা।

  • স্বপ্নাদেশ ও নিশুতি রাতের অভিজ্ঞতা: জনশ্রুতি অনুযায়ী, লক্ষ্মীনারায়ণ দে রাতে মায়ের পুজো শুরু করার অলৌকিক স্বপ্নাদেশ পান। ঠিক তার কয়েকদিন পর এক গভীর মধ্যরাতে তিনি নিজ গৃহের ভেতরে এক অলৌকিক অবয়বের হেঁটে চলার স্পষ্ট শব্দ এবং নূপুরের রিনঝিন ধ্বনি শুনতে পান।

  • যেখানে থামল নূপুর: স্বপ্নাদেশের নির্দেশ ছিল, সেই অলৌকিক নূপুরের শব্দ যেখানে গিয়ে স্তব্ধ হবে, ঠিক সেখানেই মা কালীর বিগ্রহ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে হবিবপুরের সেই নির্দিষ্ট স্থানে মায়ের আরাধনা শুরু হয়।

৩. অদ্ভুত রীতিনীতি: ১০৮ কেজি চাল, আলো বর্জন ও অহিংস বলি

লচি পোদ্দার বাড়ির পুজোর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আজও প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে পালিত হয়:

  • ১০৮ কেজি চালের নৈবেদ্য: প্রথা অনুযায়ী প্রতি বছর মায়ের উদ্দেশ্যে ১০৮ কেজি চাল উৎসর্গ করা হয়, যা কোনো অবিবাহিতা মেয়ের সারা বছরের আহারের সমতুল্য বলে ধরে নেওয়া হয়।

  • পশুবলি নিষিদ্ধ: ১৯৩৫ সাল থেকে এই মন্দিরে বলির প্রথায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়। পশুবলি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে চালকুমড়ো, তরমুজ ও আখ দিয়ে প্রতীকী বলি দেওয়া হয়।

  • বৈদ্যুতিক আলো বর্জন: আরাধনার সময় গোটা মন্দির চত্বরে কোনো বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো হয় না। ঝাড়বাতি, মোমবাতি এবং মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোতেই সম্পূর্ণ পুজো সম্পন্ন হয়।

  • ঐতিহ্যবাহী পোশাক: পুজোর সময় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা লাল পেড়ে সাদা ধুতি ও গায়ে লাল চাদর (স্থানীয় ভাষায় ‘পাল্লা’) এবং মহিলা সদস্যরা লাল বা সবুজ পেড়ে শাড়ি পরিধান করেন।

৪. বিসর্জনের অনন্য শোভাযাত্রা ও গোরু ছাড়া গোরুর গাড়ি

লচি পোদ্দার কালীবাড়ির বিসর্জন প্রক্রিয়া গোটা মেদিনীপুর শহরের এক অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক আকর্ষণ।

  • কবিগানের আসর: বিসর্জনের দিন সকালে মন্দির প্রাঙ্গণে বসে প্রাচীন ‘কবিগানের আসর’। দূর-দূরান্ত থেকে আগত কবিয়ালরা মায়ের স্তব ও সামাজিক নানা বিষয়ে চাপানউতোরে মেতে ওঠেন।

  • গোরু ছাড়া গোরুর গাড়ি: বিকেলে বিসর্জনের সময় প্রতিমা তোলা হয় গোরুর গাড়িতে, তবে তাতে কোনো গোরু জোড়া হয় না! পরিবারের সদস্য ও ভক্তরা নিজেরাই সেই গাড়ি টেনে কংসাবতী নদীর ঘাটের দিকে নিয়ে যান।

  • মশাল ও আতশবাজি: মধ্যরাতের অন্ধকারে মশালের আলো আর চোখধাঁধানো আতশবাজির রোশনাই ছড়িয়ে শহরের পথ ধরে এগিয়ে চলে এই ঐতিহাসিক বিসর্জন শোভাযাত্রা।

আরও পড়ুনঃ  অপঘাতে মৃত যুগলের অস্থি ও করোটিতে নির্মিত বিগ্রহ; মেদিনীপুরের মহতাবপুর পদ্মাবতী মহাশ্মশানের অলৌকিক ‘মা উগ্রতারা তন্ত্রপীঠ’

ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য (কীভাবে পৌঁছাবেন):

  • রেলপথে: হাওড়া থেকে লোকাল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে মেদিনীপুর স্টেশনে নেমে যেকোনো অটো বা টোটো ধরে সোজা চলে যাওয়া যায় হবিবপুর লচি পোদ্দার কালীবাড়ি।

  • সড়কপথে: ১৬ নম্বর জাতীয় সড়ক (মুম্বাই রোড) ধরে খড়গপুর হয়ে মেদিনীপুর শহরে ঢুকে হবিবপুর এলাকায় পৌঁছানো অত্যন্ত সহজ।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন