কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
ভোরের আকাশ তখনও পুরোপুরি চোখ মেলেনি, কুয়াশার পাতলা চাদর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন পলাশ গাছটি। সেইসময় নিস্তব্ধতার বুক চিরে যখন এক ফালি রোদের মতো সানাইয়ের ভৈরবী সুর আকাশে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই বোঝা যায় বাঙালির উঠোনে আজ উৎসবের আলপনা পড়েছে। নহবতের সেই সুর যেন কেবল সুর নয়, এক প্রাচীন আর্তি, যা যুগ যুগ ধরে বাঙালির বিয়ের ললাটে চন্দনের তিলক পরিয়ে দিচ্ছে।
এককালে বনেদি বিয়েবাড়ির প্রবেশদ্বারে উঁচু কাঠের মাচায় নহবতখানা ছিল এক চেনা ছবি। পরিস্থিতি বদলেছে। বর্তমান প্রজন্ম কার্যত ভুলতে বসেছে নহবতের সুর। বাঙালি বিয়ের আঙিনায় ঢুকে পড়া ‘মেহেন্দি’, ‘সংগীত’, ‘সগুন’-এর ভিড়ে নহবতখানা বিস্ময়কর বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তবে ‘লাল তালিকাভুক্ত’ হলেও নহবতখানা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এখনও বনেদিয়ানা এবং ঐতিহ্যের প্রতীক হিসাবে অনেক বিয়েবাড়িতেই বসছে নহবতের আসর। তবে কালের নিয়মে মূল আকর্ষণ, সানাই-কে রেখে নহবতের নয় বাদ্যযন্ত্রের সংখ্যা কমে কোথাও হচ্ছে তিন, কোথাও চার। আসলে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কর্তাদের হাত ধরেই খানিকটা বদলে গিয়েছে নহবতের দরবারি মেজাজ।
আরও পড়ুনঃ সবজি বাজারে দামের ওঠানামা চোখে পড়ার মতো; আজ সপ্তাহের প্রথম দিন সবজি বাজারের হালচাল
শিল্পী যখন সানাইয়ে তাঁর হৃদয়ের সমস্ত উত্তাপ ফুঁ দিয়ে ঢেলে দেন, তখন মনে হয়, আকাশ আর মাটির মধ্যে এক মায়াবী সেতু রচিত হয়েছে। সেই সুরে থাকে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য। কিছুক্ষণ পরেই যে মেয়েটি শৈশবের ধুলোবালি ঝেড়ে নতুন এক অজানার পথে পা বাড়াবে, নহবত যেন তার কানে কানে বলে যায় এক চিরন্তন বিচ্ছেদের মহাকাব্য। তবে সেই কাব্য শুনতে হলে মোটা দাগে খরচ করতে হয় গাঁটের কড়ি। যার যেমন কড়ির জোর তাঁর নহবত তেমনভাবেই সাজিয়ে দেন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কর্তারা। শিলিগুড়ির তেমনই একটি সংস্থার অংশীদার মহুয়া রায়ের কথা, ‘সানাই, হারমোনিয়াম, করতাল জাতীয় একটি বাদ্যযন্ত্র এবং তবলা- বর্তমানে এই চার বাদ্যযন্ত্রের নহবতই স্যান্ডার্ড হিসাবে বাজারে চলছে। বিয়ে, বধূবরণ দুই অনুষ্ঠানের জন্যই নহবতের অর্ডার মিলছে।’
মহুয়া জানিয়েছেন, এক রাতের জন্য (সন্ধ্যা থেকে গড়ে পাঁচ ঘণ্টা) স্থানীয় শিল্পীদের চার সদস্যের নহবতের জন্য খরচ হয় কমপক্ষে ৩৫ হাজার টাকা। সারাদিনের (ভোর থেকে বিয়ে শেষ হওয়া পর্যন্ত) জন্য খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আবার নহবতখানায় উত্তরপ্রদেশের শিল্পীদের বসাতে হলে লক্ষাধিক টাকা খরচ করতে হবে বলেই জানিয়েছেন অন্য একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার কর্তা মিল্টন পাল। তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন ঘরানার নহবতশিল্পী আছেন। একেক ঘরানার খরচ একেক রকম। বেনারসে বিসমিল্লা ও অনন্ত ঘরানা এবং মহারাষ্ট্রে গায়কোয়াড় ঘরানার শিল্পীদের বাংলায় কদর বেশি। মিল্টনের মতো আরও অনেক সংস্থাই চাহিদা অনুসারে নানা ঘরানার শিল্পীদের বুকিং করেন। মিল্টনের কথা, ‘নহবতের বিশাল চাহিদা আছে তা নয়। তবে প্রতিবছর বিয়ের মরশুমে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে গোটা দশেক অর্ডার পাই। এবছর এখনও মালদায় একটি অর্ডার পেয়েছি।’ ইমন, দরবারি, বেহাগ, রাগেশ্রী, বাগেশ্রী, শিবরঞ্জনি, আশাবরি, ভিমপলাশী, ভূপালি, পূরবী, কাফি- দিনের সময় অনুযায়ী নহবতের সুর বদলে যায়। সূর্য যখন মধ্যগগনে, বাড়ির উঠোনে তখন হলুদের সুবাস আর শাঁখের ব্যস্ততা। নহবতের সুর তখন আর বিষণ্ণ থাকে না; তা হয়ে ওঠে চপল, চঞ্চল। ঢোলক আর করতালির সঙ্গে মিলেমিশে সানাই তখন গ্রাম্য লোকগানের সুর ধরে। বাড়ির আম্রপল্লব আর বরণডালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই সুরটি যেন উৎসুক চোখে দেখে নেয় কার গায়ে আজ প্রথম হলুদের ছোঁয়া লাগল, কার চোখে আজ লজ্জার কাজল গভীর হল।
গোধূলিবেলায় নহবতের রূপ বদলে যায় এক গম্ভীর মায়ায়। আকাশ যখন সিঁদুররাঙ্গা, সানাইয়ের সুরে তখন খেলা করে ‘পূরবী’ বা ‘ইমন’। এই সুরের ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকে এক অস্থির প্রতীক্ষা। আগুনের শিখাকে সাক্ষী রেখে যখন মালাবদল হয়, তখন নহবতের সেই মূর্ছনা যেন হয়ে ওঠে দেবলোকের আশীর্বাদ। আগুনের শিখা আর ধূপের ধোঁয়ার মাঝে সানাইয়ের সুর তখন এক অলৌকিক আবহ তৈরি করে, যেখানে রক্ত-মাংসের মানুষগুলো মুহূর্তের জন্য হয়ে ওঠে কোনও পৌরাণিক আখ্যানের নায়ক-নায়িকা।
আরও পড়ুনঃ শীতের মরশুম জাঁকিয়ে পড়েছে; আজ ফের বঙ্গে কমতে পারে উষ্ণতার পারদ
বংশপরম্পরায় বিয়েবাড়িতে সেই সুরের জাদুতে বহু মানুষকে মোহিত করেছে দিনহাটার পেটলার কমল ব্যাধের নহবত পার্টি। কমল কোনও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের হয়ে কাজ করেন না। উত্তরবঙ্গে এরকম নহবত পার্টি আর আছে কি না তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। এবছর এখনও তিনটে বিয়েবাড়ির নহবতখানা মাতিয়েছেন কমলরা। তাঁর কথা, ‘এখনও অনেক মানুষ আছেন যাঁরা সুরের কদর জানেন। তাঁরাই বিয়েতে নহবতের আয়োজন করেন। নইলে ডিজের দাপটে কবেই আমরা ভ্যানিশ হয়ে যেতাম।’
আসলে নহবত শুধু সুর নয়, ইতিহাসের আঁধার থেকে উঠে আসা এক অনাবিল আলো। মুসলিম শাসকদের দরবারি গাম্ভীর্যের কোলে জন্ম নেওয়া এই বাদ্যদলের সুর একদিন নেমে এল হিন্দু বিয়েবাড়ির তুলসীতলার পাশে, পবিত্র আগুনের মৃদু কাঁপুনিতে। যেন ইতিহাস নিজের অজান্তেই লিখে ফেলল সম্প্রীতির এক অপূর্ব বাণী। সানাইয়ের প্রথম দীর্ঘ টানটা যেন কোনও অদৃশ্য সেতু বেঁধে দিল নবাবি দরবার আর বাঙালি গৃহস্থের অন্তঃপুরের মাঝে।
তবে নহবতের আসল জাদুটি লুকিয়ে থাকে বিদায়বেলায়। রাত যখন নিঝুম, বিদায়লগ্নের সেই করুণ সুরটি যখন বাতাসের গায়ে চাবুক মারে, তখন পাষাণ হৃদয়েও ঢেউ ওঠে। কন্যার বিদায়যাত্রায় সানাই যখন কেঁদে ওঠে, তখন মনে হয় প্রতিটি পর্দা যেন এক-একটি অশ্রুবিন্দু। সেই সুর যেন বলতে চায়, মিলন তো ক্ষণিকের, কিন্তু এই বিচ্ছেদের সুরটিই চিরন্তন। নহবতখানা থেকে ভেসে আসা সেই শেষ তানটুকু পাড়ার সীমানা ছাড়িয়ে দূর দিগন্তে মিলিয়ে যায়, রেখে যায় শুধু এক বুক হাহাকার আর কিছু অমলিন স্মৃতি।





