দিল্লির বুকে এক চরম নাগরিক বিপর্যয়ের নতুন এবং ভয়ঙ্করতম অধ্যায় চোখের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে, যা কেবল বাতাস বা যানজটের চেনা সংকট নয়, বরং মানুষের বেঁচে থাকার আদিমতম অধিকারকে একবারে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলছে। দেশের রাজধানীর অন্যতম প্রধান এবং জনবহুল আবাসিক এলাকা জনকপুরীর বি ই ব্লক আজ এক অবর্ণনীয় নরকযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
সকালবেলা ঘরের কলটি খুললেই যে তরলটি বালতিতে এসে পড়ছে, তাকে জল বলে চিনে নেওয়া অসম্ভব; সেটি আসলে কুচকুচে কালো, ঘন নর্দমার পাঁক। বাতাসে ভাসছে এক তীব্র, দমবন্ধ করা পচা ডিমের মতো গন্ধ, যা মূলত হাইড্রোজেন সালফাইড এবং বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাসের রাসায়নিক সংমিশ্রণে তৈরি এক ভয়ঙ্কর কুয়াশা। এই বিলাসবহুল গেটেড কমিউনিটির বাসিন্দারা আজ এতটাই নিরুপায় যে, সামান্য স্নান করার জন্য কিংবা গায়ের সাবান ধোয়ার জন্য বাজার থেকে চড়া দামে ২০ লিটারের বিসলারি জলের জার কিনে আনতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিটি পরিবারকে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচটি এই ধরনের জলের বোতল কিনতে হচ্ছে, যা মাসের শেষে এক বিপুল এবং অপ্রত্যাশিত আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।
মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানুষের ঘরের আধুনিক অ্যাকোয়াগার্ড বা আর ও (RO) ফিল্টারগুলো এই বিষাক্ত জলের চাপে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ছে; মাত্র তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে ফিল্টারের ভেতরের অংশ ঘন কালো কাদায় বুজে গিয়ে তা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সংকটের রূপটি আরও বেশি নির্মম হয়ে ওঠে যখন এই ব্লকের সীমানা পেরিয়ে বি-১সি ব্লকের মতো নিম্নবিত্ত এলাকাগুলোর দিকে তাকানো যায়।
আরও পড়ুনঃ ভয়াবহ! পুড়বে দেশ, ৪৬ ডিগ্রির হাই-অ্যালার্ট জারি
সেখানে বসবাসকারী দিনমজুর বা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিদিন এই বিপুল টাকা খরচ করে বোতলের জল কেনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাদের ঘরের মায়েদের, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন ভোরবেলা থেকে মাইলের পর মাইল হেঁটে কোনো সরকারি জলের গাড়ি বা দূরবর্তী ট্যাঙ্কারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হচ্ছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এক ফোঁটা পরিশ্রুত জলের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই তীব্র বৈষম্য এবং বেঁচে থাকার দৈনন্দিন গ্লানি জনকপুরীর আকাশকে প্রতিদিন আরও বেশি ভারী করে তুলছে।
অথচ সরকারি উদাসীনতা এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার দেওয়াল এতটাই নিরেট যে, আজ পর্যন্ত এই বি ই ব্লকের জলের কোনো সরকারি নমুনা সংগ্রহ বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয়নি। কিন্তু এই চরম সংকটের বৈজ্ঞানিক এবং চিকিৎসাগত সত্যটি লুকিয়ে আছে ঠিক পাশের এ-১ ব্লকের এক সাম্প্রতিক আইনি লড়াইয়ের নথিতে। ন্যাশনাল গ্রীন ট্রাইব্যুনাল বা এনজিটি-তে চলা মামলার (Original Application No. 116/2025) নির্দেশে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বা সিপিসিবি (CPCB) যখন ওই এলাকার জলের নমুনা পরীক্ষা করে, তখন যে রিপোর্ট সামনে আসে তা যেকোনো সভ্য সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ভারতের ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (BIS 10500) অনুযায়ী যে পানীয় জলে মানবদেহের মলমূত্রজনিত জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি সম্পূর্ণ শূন্য থাকার কথা, সেখানে জনকপুরীর প্রতিটি বাড়ির জলের নমুনায় ধরা পড়েছে কোটি কোটি টোটাল কলিফর্ম এবং ই-কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়া। একটি নির্দিষ্ট নমুনায় প্রতি ১০০ মিলিলিটার জলে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা পাওয়া গেছে প্রায় ১৬ লক্ষ (16×10⁵ MPN/100mL), যা পরিমাপের সমস্ত চেনা বিজ্ঞানকে ছাড়িয়ে গেছে। এই বিষাক্ত তরল শরীরে প্রবেশ করার ফলে বা এটি দিয়ে নিয়মিত হাত-মুখ ধোয়ার কারণে স্থানীয় জনস্বাস্থ্যে এক মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। এলাকার প্রবীণ চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক মাসে জনকপুরী এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলে টাইফয়েড, জন্ডিস, তীব্র গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস এবং কলেরার মতো জলবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক ধাক্কায় প্রায় ৫০ শতাংশ (50%) বৃদ্ধি পেয়েছে।
ছোট ছোট শিশুরা চর্মরোগ এবং পেটের যন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত ছটফট করছে। এই ভয়ঙ্কর সত্য কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ভারতের কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি (CAG)-র ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক অডিট রিপোর্টেরই এক নির্মম প্রতিফলন, যেখানে পরিষ্কার করে সতর্ক করা হয়েছিল যে দিল্লি জল বোর্ডের (DJB) সরবরাহ করা ভূগর্ভস্থ জলের প্রায় ৫৫ শতাংশই (55%) সম্পূর্ণ পানের অযোগ্য এবং মানবশরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এই সম্পূর্ণ ধ্বংসাবশেষের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কয়েক দশকের পরিকাঠামোগত অবহেলা এবং চূড়ান্ত প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা, যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘ক্রস-কনট্যামিনেশন’। জনকপুরীর মাটির নিচে থাকা পানীয় জলের মূল পাইপলাইনগুলো আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে বসানো হয়েছিল, যা দীর্ঘদিনের অবহেলায় সম্পূর্ণ জং ধরে, ক্ষয়ে গিয়ে মাটির নিচে ফাটল তৈরি করেছে। সবথেকে বড় বিপর্যয়টি হলো, এই জীর্ণ পানীয় জলের লাইনের ঠিক সমান্তরালেই চলে গেছে এলাকার বড় বড় নর্দমা এবং সুয়ারেজ লাইন। দিল্লি জল বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা জল সরবরাহ করা হয় না, বরং দিনে নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার জন্য জল ছাড়া হয়। যখনই জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখনই এই শূন্য পাইপলাইনগুলোর ভেতরে এক ধরনের ঋণাত্মক চাপ বা ভ্যাকুয়ামের সৃষ্টি হয়। এই ভ্যাকুয়াম তখন আশেপাশের নোংরা নর্দমা এবং লিক হওয়া সুয়ারেজ লাইন থেকে সমস্ত মলমূত্র, বিষাক্ত রাসায়নিক এবং কালো কাদা নিজের ভেতরে টেনে নেয়। এরপর যখন আবার জল সরবরাহ চালু হয়, তখন সেই জং ধরা পাইপের প্রথম ধাক্কায় মানুষের ঘরের চৌবাচ্চা বা আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাঙ্কে গিয়ে জমা হয় সরাসরি নর্দমার তরল মল।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর অন্তর এই অঞ্চলের বড় ট্রাঙ্ক সুয়ারেজ লাইনগুলোর পলি পরিষ্কার করা বা ‘ডেসিল্টিং’ করা বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু সরকারি নথিতেই প্রমাণিত যে জনকপুরীতে ২০১৩ সালের পর থেকে দীর্ঘ ১৩ বছর কোনো সুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার করার কাজই করা হয়নি। ফলে মাটির নিচে জমে থাকা নোংরা আবর্জনা উপচে পড়ে গ্রাস করেছে পানীয় জলের উৎসকে।
জনগণের তীব্র ক্ষোভ এবং আদালতের চাবুকের মুখে পড়ে দিল্লি জল বোর্ড অবশেষে ১৩ কোটি টাকার একটি পাইপলাইন প্রতিস্থাপন এবং ডেসিল্টিং প্রকল্প ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সেই কাজেও পরিকাঠামোগত টালবাহানা এবং লাল ফিতের ফাঁস সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে দীর্ঘায়িত করেছে। দিল্লি জল বোর্ড আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছে যে, ১,১৪০ মিটার দীর্ঘ যে সুয়ারেজ লাইনটি বদলানোর কথা ছিল, তার মধ্যে আজ পর্যন্ত মাত্র ৪৫০ মিটার কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত মহিলাদের, পুরুষ কি নয় মানুষ?
এর পেছনে তারা অজুহাত দিয়েছে যে, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসের তীব্র বায়ুদূষণের কারণে দিল্লিতে গ্র্যাপ (GRAP Stage III & IV) বিধি চালু থাকায় সমস্ত ধরনের খোঁড়াখুঁড়ি এবং নির্মাণকাজ সরকারি নির্দেশে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এই ধীরগতির কাজের জন্য প্রথমে ২০২৬ সালের ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে মে মাসের এই প্রখর গ্রীষ্মেও পরিস্থিতি বিন্দুমার বদলায়নি, বরং জলের রঙ দিন দিন আরও বেশি গাঢ় কালো হয়ে উঠছে।
এই চরম সংকটের মাঝেও প্রশাসনের অসংবেদনশীলতা সাধারণ মানুষকে আরও বেশি আঘাত করেছে, যখন দিল্লি জল বোর্ড সম্প্রতি একটি প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে যে জনকপুরীর জল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সেখানে কোনো সমস্যা নেই। এই ঘটনাকে স্থানীয় রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা সরাসরি এক ‘প্রশাসনিক পরিহাস’ বা মানসিক প্রতারণা বলে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন।
আদালতের ঘরের ফাইল, কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প এবং কাগজের ওপর থাকা বড় বড় আশ্বাসের কোনো মূল্যই আজ জনকপুরীর বি ই ব্লকের মানুষের কাছে অবশিষ্ট নেই, কারণ প্রতিদিন সকালে তাঁদের চোখের সামনে নেমে আসা সেই কালচে নোংরা জল তাঁদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, একবিংশ শতাব্দীর এক তথাকথিত আধুনিক মহানগরে তাঁরা কতটা অসহায়, কতটা একা।



